পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই রাজ্য রাজনীতিতে একের পর এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর গতিবিধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আজ, শনিবার নিজের জীবনের প্রথম হাই-প্রোফাইল প্রশাসনিক বৈঠক করতে চলেছেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু চমকের এখানেই শেষ নয়; মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রথম প্রশাসনিক পর্যালোচনার জন্য বেছে নিয়েছেন খোদ তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা বিদায়ী জমানার অলিখিত ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসদীয় কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারকে। শুভেন্দুর এই অতর্কিত ডায়মন্ড হারবার সফরকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বঙ্গ রাজনীতির পারদ হু হু করে চড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা, অভিষেকের খাসতালুক থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা তথা সমগ্র রাজ্যের জন্য একগুচ্ছ মেগা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা করতে পারেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রশাসন ও নবান্ন সূত্রে খবর, আজ দুপুর ১টা নাগাদ ডায়মন্ড হারবারের একটি বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলে এই হাই-প্রোফাইল মেগা বৈঠকটি শুরু হতে চলেছে। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কৌশলগত কারণে এই বৈঠকটিকে মূলত দুটি প্রধান দফায় ভাগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রথম দফায়, ডায়মন্ড হারবার, সুন্দরবন এবং বারুইপুর পুলিশ জেলার সমস্ত উচ্চপদস্থ আইপিএস (IPS) আধিকারিকদের পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসবেন তিনি। এই পর্বে মূলত এলাকার আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখার পাশাপাশি পূর্বতন সরকারের আটকে থাকা প্রকল্পগুলির অগ্রগতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে।
এরপরই শুরু হবে দ্বিতীয় দফার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বৈঠক। এই দফায় ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সমস্ত বিধানসভা এলাকার বিধায়কদের নিয়ে এক টেবিলে বসবেন মুখ্যমন্ত্রী। কোন এলাকায় কোন কাজ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আটকে রয়েছে, সাধারণ মানুষের ঠিক কী কী ক্ষোভ বা অভাব-অভিযোগ রয়েছে, তা সরাসরি বিধায়কদের মুখ থেকে শুনবেন তিনি। এই বৈঠক যে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক খোলনলচে বদলে দেবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এদিকে, নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে নিজেদের এলাকায় স্বাগত জানাতে ডায়মন্ড হারবার জুড়ে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উন্মাদনা তুঙ্গে। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে বিশাল জমায়েত ও সংবর্ধনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষমতার এই টানটান উত্তেজনার মাঝে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, তার জন্য ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলা কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে। যে হোটেলে এই মেগা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেটি কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশে জারি হয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
তৃণমূল জমানায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তথাকথিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ঢাকঢোল পেটানোর খামতি ছিল না। এবার সেই মডেলের দর্প চূর্ণ করতেই কি শুভেন্দু অধিকারী তাঁর প্রথম প্রশাসনিক কর্মসূচির জন্য এই কেন্দ্রটিকে বেছে নিলেন? এই প্রশ্নেই এখন তোলপাড় রাজনৈতিক মহল। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ঝোড়ো সফরের মাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট এবং কড়া বার্তা দিতে চান যে, নতুন সরকারের কাছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট ‘গড়’ বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ থাকবে না। ডায়মন্ড হারবারের এই মেগা প্রশাসনিক বৈঠক শেষ করেই মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি রওনা দেবেন ফলতার উদ্দেশ্যে, কারণ সেখানে আজই রয়েছে একটি হাই-ভোল্টেজ দলীয় কর্মীসভা, যা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।





