‘২০২১-এর হিংসায় নাম থাকলে সোজা জেল!’ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বিরোধী দলনেতাকে চরম হুঁশিয়ারি শুভেন্দু অধিকারীর

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নয়া বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই চরম উত্তেজনা ও রাজনৈতিক তরজা ছড়াল। স্পিকার নির্বাচন পর্বকে কেন্দ্র করে এদিন বিধানসভার অন্দরে মুখোমুখি সংঘাতে জড়ালেন নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং নবগঠিত বিরোধী দলনেতা তথা প্রবীণ তৃণমূল কংগ্রেস নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ভোট-পরবর্তী হিংসা, স্বৈরাচার এবং বিরোধী বিধায়কদের ঘরছাড়া হওয়ার অভিযোগ তুলে নতুন সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন শোভনদেব। যার পাল্টা কড়া জবাব দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

স্পিকার নির্বাচন পর্বে আজ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পরই বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে বক্তৃতা করতে ওঠেন প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বর্তমান রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শাসকদল বিজেপির ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগানকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “আমি দশমবার এলাম এই বিধানসভায়। আমার অভিজ্ঞতা আছে বিরোধী ও শাসক দলে থাকার। আজ রাজ্যে ভয় চার গুণ বেড়ে গিয়েছে। বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। নির্বাচনকে গণতন্ত্রের উৎসব বলা হয়, কিন্তু আজ ভয় আছে, ভরসা নেই।” মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীকে বলব, ভয় নেই যখন বলেছেন সেটা ব্যবস্থা করুন। অগণতান্ত্রিক উপায়ে যা হয়েছে তাতে স্বৈরাচারীর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। গণতন্ত্র ধ্বংস হলে মুশকিল।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি তাঁদের জ্ঞান না দিয়ে রাস্তায় নামার কথা বলছেন, অথচ তাঁদের অসংখ্য দলীয় কর্মী আজ ঘরছাড়া হয়ে রাস্তায় ঘুরছেন।

বিরোধী দলনেতার এই ঝাঁঝালো ভাষণের পরই শাসকদলের বিধায়কদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও স্লোগান শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতেই আসরে নামেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শোভনদেবের ‘ঘরছাড়া’ তত্ত্বকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পাল্টা বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন ঘরছাড়াদের ঘরে ঢোকাতে। কেউ ঘরছাড়া আছে বলে আমার জানা নেই। আপনি ডিজিপির কাছে তালিকা দিন।” এর পরেই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং কড়া শর্ত জুড়ে দেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “পরিষ্কার শর্ত, ২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসায় যাঁর নাম নেই, যাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ নেই, তাঁকে সসম্মানে বিজেপি বিধায়ক এবং পুলিশ সুপার (SP) ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে তাকে জেলে যেতে হবে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যে কার্যত শোরগোল পড়ে যায় বিরোধী বেঞ্চে।

পাল্টা আক্রমণের পাশাপাশি অবশ্য সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য মেনে বিরোধী দলকে ধন্যবাদ ও বার্তা দিতেও ভোলেননি মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “বিরোধীদের সকলকে এই ঐতিহাসিক বিধানসভায় আমার ও সরকারের পক্ষে ধন্যবাদ। প্রধান বিরোধী দলকে স্পিকার নির্বাচনে পরম্পরা বজায় রাখার জন্য ধন্যবাদ। আশা করব এই বিধানসভা তার গুরুত্ব পালন করবে। আমাদের ভুলভ্রান্তি, ত্রুটি-বিচ্যুতি আজ দেখতে চাই না।” একই সঙ্গে তিনি জানান যে, আগামী দিনে বিধানসভার পরিকাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসের পর বিধানসভার আসন সংখ্যা বাড়তে পারে। তাই নতুন একটি আধুনিক বিধানসভা ভবন নির্মাণের ব্যাপারেও সমস্ত দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

বিরোধীদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনারা সংখ্যায় কম, আমাদের সংখ্যা বেশি। তাও সব বিষয়ে ৫০:৫০ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিরোধী দলের বিধায়করা সরাসরি মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করুন, মন্ত্রীরা তাঁদের সময় দেবেন। এমনকি কোনো এলাকায় মন্ত্রীরা সরকারি কর্মসূচিতে গেলে যেন দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বিধায়কদের ডেকে পাঠানো হয়, সেই নির্দেশও দেওয়া থাকবে। আমাকে কোনো বিধায়ক চিঠি দিলে আমি তার যথাযথ প্রত্যুত্তর দেব এবং প্রাপ্তি স্বীকার করব।” তবে একই সঙ্গে বিরোধীদের সংসদীয় নিয়ম মেনে চলার বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আশা করব বিধানসভা চলার ক্ষেত্রে বিধায়করা নিয়মিত উপস্থিত থাকবেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে যোগ দেবেন। বিরোধীদের বিরোধিতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু প্রথম দিন থেকে বিএ কমিটির নির্দেশ বানচাল করা থেকে তারা বিরত থাকবেন। বিধায়কের পারফরম্যান্স মানুষ সরাসরি দেখতে পায়, তাই এলাকার মানুষের জন্য কাজ করাটাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।”

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy