প্রেম বা ভালোবাসা কীভাবে শুরু হয়, তার নির্দিষ্ট কোনও ব্যাকরণ নেই। কারও কাছে এটি এক পলকের ভালো লাগা, কারও কাছে মনের টান। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে সম্পর্কের সংজ্ঞা দ্রুত বদলাচ্ছে। এখনকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডেটিং নিয়ে দানা বাঁধছে এক নতুন ধারণা, যার নাম দেওয়া হয়েছে— ‘শ্রেকিং’ (Shrecking)। টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের দেওয়ালে এখন এই শব্দটি ঘিরেই চলছে তুমুল চর্চা।
আসলে কী এই ‘শ্রেকিং’?
‘শ্রেক’ নামটির সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। জনপ্রিয় অ্যানিমেশন ছবিতে এক সবুজ, অদ্ভুত দর্শন দৈত্যের নাম ছিল শ্রেক, যে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা খুঁজে পায়। কিন্তু ডেটিং দুনিয়ায় এই শব্দের অর্থ কিছুটা আলাদা এবং বিতর্কিত।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন কেউ জানবুঝে নিজের ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বা চাহিদার মাপকাঠি কমিয়ে এমন কাউকে ডেট করেন, যাঁকে সমাজ হয়তো খুব একটা ‘আকর্ষণীয়’ মনে করে না— তখনই তাকে ‘শ্রেকিং’ বলা হচ্ছে। এই ধারণার মূলে রয়েছে এক অদ্ভুত বিশ্বাস: সঙ্গী যদি দেখতে খুব একটা ভালো না হন, তবে তিনি সম্পর্কে বেশি যত্নশীল হবেন এবং ছেড়ে যাওয়ার ভয় কম থাকবে।
কেন বাড়ছে এই অদ্ভুত প্রবণতা?
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে এখন চারিদিকে শুধু নিখুঁত চেহারার মানুষের হাতছানি। কিন্তু পর্দার এই গ্ল্যামারের আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রতারণা, মানসিক আঘাত এবং ঘনঘন বিচ্ছেদের গল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার এই ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে আজকের প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের ‘ডেটিং ক্লান্তি’ কাজ করছে। অনেক তরুণ-তরুণীই এখন ভাবছেন, খুব হ্যান্ডসাম বা সুন্দরী সঙ্গী বেছে নিলে হয়তো প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই তাঁরা এমন কাউকে খুঁজছেন, যেখানে শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে মানসিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বেশি থাকবে।
অন্ধকার দিক ও মনস্তত্ত্ব
টিকটকে এক ব্যবহারকারীর মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এমন কাউকে ডেট করব যে খুব হ্যান্ডসাম নয়, কারণ সে অন্তত আমায় ছেড়ে যাবে না।” তবে মনোবিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে একেবারেই সমর্থন করছেন না। তাঁদের মতে, এটি মূলত মানুষের অন্তর্নিহিত হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্কের স্থায়িত্ব বা সততা কখনওই কারও বাহ্যিক চেহারার ওপর নির্ভর করে না। কম আকর্ষণীয় মানুষও প্রতারণা করতে পারে, আবার অত্যন্ত সুদর্শন মানুষও হতে পারেন শ্রেষ্ঠ জীবনসঙ্গী। কাউকে তাঁর রূপের ভিত্তিতে ‘নিরাপদ’ ভাবা এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কী চাইছে আজকের জেনারেশন?
শ্রেকিং ট্রেন্ডটি হয়তো সাময়িক, কিন্তু এটি একটি রূঢ় সত্যকে সামনে এনেছে— আজকের দিনে মানুষ কেবল দেখার নয়, বরং অনুভব করার মতো ভালোবাসা খুঁজছে। তারা এমন এক সঙ্গীর সন্ধানে আছে, যে কেবল প্রোফাইল পিকচারে নয়, বাস্তব জীবনেও পাশে থাকবে।
তবে সাবধান! শুধু নিরাপত্তার খোঁজে কাউকে ছোট করে দেখা বা নিজের মানদণ্ড কমিয়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করতে পারে। দিনশেষে ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই যে কোনও সম্পর্কের আসল ‘ইউএসপি’।





