প্রিয়জনকে হারানো মানুষের জীবনের সবথেকে বড় মানসিক ট্রমা। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, স্ত্রী বা অত্যন্ত কাছের কাউকে হারানোর পর কোনো কোনো স্বামী বাইরে থেকে অস্বাভাবিক রকমের শান্ত বা আবেগহীন আচরণ করেন। কান্নাকাটি না করে তাঁদের এই নির্বিকার থাকা দেখে সমাজের অনেকে তাঁদের ‘পাথর’ বা ‘অনুভূতিহীন’ বলে দাগিয়ে দেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, এই ঠান্ডা আচরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক জটিল মানসিক লড়াই।
মস্তিষ্কের প্রতিরক্ষা কবচ: অস্বীকার ও শক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় শোকের প্রথম ধাপ হলো ‘ডিনায়াল স্টেজ’ বা অস্বীকারের পর্যায়। প্রিয়জনের মৃত্যুতে মস্তিষ্ক এতটাই বড় ধাক্কা বা ‘শক’ পায় যে, সে তাৎক্ষণিক বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারে না। এই অবস্থায় আবেগ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। বাইরে থেকে ব্যক্তিকে শান্ত মনে হলেও আসলে ভেতরে ভেতরে তাঁর মস্তিষ্ক ওই কঠিন ট্রমার সঙ্গে লড়াই করার জন্য আবেগহীনতার একটি রক্ষাকবচ তৈরি করে।
সামাজিক সংস্কার: “পুরুষের কাঁদতে নেই” আমাদের সমাজব্যবস্থায় ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শেখানো হয়—‘পুরুষরা কাঁদে না’ বা ‘কান্না দুর্বলতার লক্ষণ’। এই ভুল শিক্ষা বড় হওয়ার পরও তাঁদের অবচেতন মনে গেঁথে থাকে। একে বলা হয় ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’। স্ত্রী হারানোর মতো গভীর শোকেও এই সামাজিক কাঠামোর কারণে অনেক পুরুষ তাঁদের আবেগ চেপে রাখেন। এটা অনুভূতির অভাব নয়, বরং শেখানো অভ্যাসের ফল।
একাকিত্বের শোক বা ইনট্রোভার্ট গ্রিভিং প্রত্যেক মানুষের শোক প্রকাশের ধরন আলাদা। কেউ কেঁদে হালকা হন, আবার কেউ একদম নিস্তব্ধ হয়ে যান। যাঁরা ভেতরে ভেতরে শোক পালন করেন, মনোবিজ্ঞানে তাঁদের বলা হয় ‘ইনট্রোভার্ট গ্রিভার’। তাঁরা বাইরের পৃথিবীর সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান, যাতে শোকের ভারে ভেঙে না পড়েন। এটি তাঁদের নিজস্ব ‘কোপিং মেকানিজম’।
মানসিক বিচ্ছিন্নতা বা ডিসোসিয়েশন গভীর শোকের সময় মস্তিষ্ক নিজেকে রক্ষা করার জন্য অনেক সময় বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘ডিসোসিয়েশন’। এই অবস্থায় মানুষ যন্ত্রের মতো সব কাজ করে যায়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু কোনো আবেগ অনুভব করতে পারে না। এটি মূলত মানসিক ট্রমার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
ধীর গতির শোক: শূন্যতা ধরা পড়ে পরে অনেকের ক্ষেত্রে শোকের পাহাড় সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে না। শুরুর দিকে শক এবং শূন্যতা থাকে। দিন যত এগোয় এবং একাকিত্ব বাড়তে থাকে, তখন ধীরে ধীরে বাস্তবতা প্রকট হয়। তখন হয়তো মাসের পর মাস বা বছর পার হওয়ার পর সেই সুপ্ত দুঃখ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে পারে।
উপসংহার স্ত্রী বা প্রিয়জন হারানোর পর স্বামীর নীরবতাকে নিষ্ঠুরতা ভাবা ভুল। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা শোক প্রকাশের চেয়ে কাজে ডুবে থেকে বা একা থেকে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করেন বেশি। তাই এমন পরিস্থিতিতে কাউকে বিচার না করে, তাঁর নীরব কান্নার ভাষা বোঝার চেষ্টা করাই প্রকৃত মানবিকতা।





