অপারেশন ‘সিন্দুর’-এর এক বছর পূর্ণ হলো। ভারতের সামরিক ইতিহাসে এই অভিযানটি এখন কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের গল্প নয়, বরং এটি ভারতের নয়া রণকৌশল বা ‘নিউ স্ট্র্যাটেজিক ডকট্রিন’-এর এক সফল নিদর্শন। নির্ভুল হামলা, দেশীয় প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সরকারের সর্বস্তরের ইস্পাতকঠিন সমন্বয়—সব মিলিয়ে অপারেশন ‘সিন্দুর’ বিশ্বের দরবারে ভারতকে এক অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও সরকারি মহলের বিশ্লেষণে এই অভিযানের সাফল্যের পেছনে উঠে এসেছে ছয়টি প্রধান স্তম্ভ।
১. সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের নয়া নজির:
অপারেশন সিন্দুর শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। লক্ষ্য ছিল একটাই—বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি না করে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া। মাত্র ৮৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত তার লক্ষ্য পূরণ করে এবং নিজস্ব শর্তে যুদ্ধবিরতির দিকে প্রতিপক্ষকে ঠেলে দেয়। ৯টি উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে এই ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ পরিচালনা করা হয়েছিল।
২. পাকিস্তানের গভীরে বিধ্বংসী আঘাত:
এই অভিযানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর গভীরতা। সিয়ালকোট, বাহাওয়ালপুর থেকে শুরু করে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ ও হিজবুল মুজাহিদিনের ৯টি প্রধান ঘাঁটি তছনছ করে দেওয়া হয়। এমনকি পাকিস্তানের নূর খান ও সারগোধার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিও ভারতের নিশানায় ছিল। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এই অভিযানে ১০০-র বেশি কুখ্যাত জঙ্গি খতম হয়েছে, যার মধ্যে ছিল আইসি-৮১৪ বিমান অপহরণ কাণ্ডের মূল চক্রী ইউসুফ আজহার।
৩. ক্ষতির অসমতা: ওপারে ধস, এপারে প্রায় শূন্য প্রভাব:
ভারতীয় বায়ুসেনার রাফাল যুদ্ধবিমান এবং স্ক্যাল্প মিসাইলের দাপটে মাত্র ২৩ মিনিটের এক মিশনে পাকিস্তানের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। পরবর্তী ধাপে পাকিস্তানের ১১টি এয়ারবেসে হামলা চালিয়ে তাদের মোট বিমান শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে ভারত। অন্যদিকে, ভারতের দেশীয় ‘আকাশতীর’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম শত্রুপক্ষের শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝপথেই ধ্বংস করে দেওয়ায় ভারতের ভূখণ্ডে কোনো ক্ষতি হয়নি।
৪. যৌথতা ও আত্মনির্ভর ভারতের জয়গান:
এই মিশনে সেনা, নৌ ও বায়ুসেনার অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখা গিয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ব্রহ্মোস, আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র, তেজস যুদ্ধবিমান ও ডিআরডিও-র অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের সফল প্রয়োগ প্রমাণ করেছে যে ভারত এখন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশ্বমানের। বর্তমানে ভারতের ৬৫ শতাংশের বেশি সামরিক সরঞ্জাম দেশেই তৈরি হচ্ছে।
৫. অকুতোভয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা:
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সরাসরি প্রত্যাঘাতের ছাড়পত্র পেয়েছিল। অতীতের কূটনৈতিক দোদুল্যমানতা কাটিয়ে এবারের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট—সন্ত্রাসবাদের মূল উৎপাটন করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্তরেও কূটনৈতিক জয় হাসিল করে ভারত প্রমাণ করেছে যে এটি কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার।
৬. ‘হোল অব নেশন’ পদ্ধতি:
অপারেশন সিন্দুর ছিল সমগ্র ভারতের সম্মিলিত প্রয়াস। ইসরোর (ISRO) ১০টি উপগ্রহ ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালিয়েছে। বেসরকারি স্টার্টআপ থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগ একসঙ্গে কাজ করেছে। এমনকি বিদেশের মাটিতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়েছিল। অপারেশন ‘সিন্দুর’ প্রমাণ করে দিল, আধুনিক যুদ্ধ শুধু সীমান্তের জওয়ানদের নয়, বরং এটি একটি অখণ্ড জাতীয় সঙ্কল্প।





