পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় গণতন্ত্রের যে ছবি ধরা পড়ল, তা আক্ষরিক অর্থেই নজিরবিহীন এবং ঐতিহাসিক। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বুধবার বাংলায় ভোটদানের হার পৌঁছেছে ৯২.৬৭ শতাংশে। রাজনীতির কারবারিরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান কেবল চমকে দেওয়ার মতো নয়, বরং তা বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পরিবর্তনের বছর হিসেবে পরিচিত ২০১১ সালেও যেখানে রাজ্যে ভোটের হার ছিল ৮৪.৩ শতাংশ, সেখানে ২০২৬-এর এই মহাযুদ্ধে সেই হার ৯২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া এক বড়সড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চমক দেখা গিয়েছে খোদ কলকাতায়। বরাবরই অভিযোগ ওঠে যে, মহানগরীর বাসিন্দাদের ভোটদানে অনীহা বেশি। কিন্তু এবারের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। উত্তর কলকাতায় ভোটের হার ছিল ৮৯.৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কলকাতায়, যেখানে খোদ মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতার হাই-প্রোফাইল লড়াইয়ের কেন্দ্র ভবানীপুর অবস্থিত, সেখানে ভোটের হার পৌঁছেছে ৮৭.৮৪ শতাংশে। ভবানীপুর কেন্দ্রে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৮৬.৪৩ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা গত ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ক্যানিং পূর্ব এবং ভাঙড়ের মতো এলাকাগুলোতে ভোটাভুটি হয়েছে উৎসবের আমেজে। ক্যানিং পূর্বে ৯৭.৭ শতাংশ এবং ভাঙড়ে ৯২.৩৬ শতাংশ ভোট পড়ার ঘটনা এর আগে কখনও দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই অস্বাভাবিক ভোটদানের হারের পেছনে প্রধানত দুটি কারণকে দায়ী করছেন। প্রথমত, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ভোটারদের মধ্যে এক ধরণের ‘অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ’ দেখা গিয়েছে। তালিকায় নাম বজায় রাখতে এবং নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ জোরালো করতে বুথে বুথে লাইন দিয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ।
দ্বিতীয়ত, পরিযায়ী শ্রমিকদের ভূমিকা। ভবিষ্যৎ ভোটার তালিকা সংশোধন বা নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা পেতে হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্য থেকে বাংলায় ফিরে এসেছেন শুধুমাত্র ভোট দিতে। ভোটারদের এই দৃশ্যমান তাড়াহুড়ো এবং আবাসনগুলোর ভেতরে বুথ হওয়ার ফলে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই রেকর্ড ভাঙা ভোটদানের প্রধান কারিগর। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই অতিরিক্ত বা রেকর্ড ভোট আসলে কার পালে হাওয়া দেবে? শাসক না বিরোধী— কোন দিকে ঘুরবে বাংলার ভাগ্য, তা নিয়েই এখন তুঙ্গে চর্চা।





