২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রণভূমি তত বেশি ‘ভাণ্ডার’ কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। রাজ্যের মসনদ দখলের লড়াইয়ে এখন পুরুষ ভোটারদের চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন মহিলারা। তৃণমূলের দীর্ঘদিনের তুরুপের তাস ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে বিজেপি ময়দানে নামিয়েছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’। টাকার অঙ্কের এই লড়াই এখন বাংলার অলিতে-গলিতে প্রধান চর্চার বিষয়।
টাকার লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের অন্যতম কারিগর ছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। সেই সাফল্যকে মাথায় রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ধাপে ধাপে এই প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়িয়েছে। ২০২৬-এর নির্বাচনের ঠিক আগে ফেব্রুয়ারিতে ফের বাড়ানো হয়েছে ভাতার অঙ্ক। বর্তমানে সাধারণ ও ওবিসি শ্রেণির মহিলারা মাসে ১৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি (SC) ও উপজাতি (ST) ভুক্ত মহিলারা ১৭০০ টাকা করে পাচ্ছেন। তৃণমূলের দাবি, এটি কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি প্রমাণিত পরিষেবা যা কোটি কোটি মহিলার হাতে নগদ টাকা পৌঁছে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, গেরুয়া শিবির এবার পালটা চালে চমকে দিয়েছে। বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহার বা ‘ভরসা শপথ’-এ ঘোষণা করা হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্পের কথা। বিজেপি দাবি করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মা-বোনেরা প্রতি মাসে সরাসরি ৩০০০ টাকা পাবেন, যা বর্তমান লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সুকান্ত মজুমদার ও শুভেন্দু অধিকারীদের দাবি, মে মাসে সরকার গঠন হলে জুন মাস থেকেই এই টাকা ঢোকা শুরু হবে।
বিজেপির সদস্য সংগ্রহ বনাম মমতার হুঁশিয়ারি
বিজেপি কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। সুকান্ত মজুমদার দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের বিজেপি সদস্য করতে এবং অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ‘ফর্ম’ বা সদস্যপদ ফর্ম পূরণ করাতে। লক্ষ্য— প্রায় এক কোটি মহিলাকে দলের ছাতার তলায় আনা। পাল্টা আক্রমণ শানাতে দেরি করেননি মুখ্যমন্ত্রী। সিউড়ির জনসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “বিজেপি ভোটের আগে টাকার লোভ দেখাচ্ছে। ওদের টাকা নেবেন না, নিলেই বাড়িতে ইডি বা সিবিআই ঢুকে পড়বে।” তৃণমূল নেত্রীর দাবি, বিজেপি শাসিত অন্য রাজ্যে এমন সুবিধা নেই, তাই বাংলায় এগুলো কেবলই নির্বাচনী ‘ভাঁওতাবাজি’।
ভোটের সমীকরণ ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার ২.২১ কোটি মহিলা ভোটারই নির্ধারণ করবেন আগামী দিনে নবান্নের দখল কার হাতে থাকবে। কর্ণাটক বা দিল্লির মডেলে বিজেপি বাংলায় প্রভাব ফেলতে মরিয়া। তবে প্রশ্ন উঠছে রাজ্যের কোষাগার নিয়ে। বছরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি খরচ করার ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গের আছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ‘স্থায়ী ভরসা’ জয়ী হবে, না কি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ‘বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি’— তার উত্তর মিলবে ভোটের বাক্সেই।





