একদিকে ফিলিং স্টেশনের সামনে মাইলের পর মাইল যানবাহনের সারি, অন্যদিকে সরকারি খাতায় জ্বালানি তেলের ‘রেকর্ড মজুত’। দেশের জ্বালানি বাজারে এক অদ্ভুত ‘তেলেসমাতি’ কাণ্ড শুরু হয়েছে। সরকার বলছে তেলের কোনো অভাব নেই, কিন্তু সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরছে। এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে— মজুত যদি থেকেই থাকে, তবে তেল যাচ্ছে কোথায়?
সরকারের হাতে তেলের পাহাড়!
জ্বালানি বিভাগের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সব থেকে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি এখন মজুত আছে। এমনকি আগামী জুন মাস পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর সক্ষমতাও সরকারের রয়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, পাম্পগুলোতে চাহিদার তুলনায় ২৫ শতাংশ বাড়তি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবুও কেন হাহাকার? সরকারের দাবি, মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বাইং’ বা আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি কেনার প্রবণতা এবং অবৈধ মজুতদারদের কারসাজিই এই কৃত্রিম সংকটের মূল কারণ।
বাস্তব চিত্র: ১২০ টাকার তেল ২২০ টাকায়!
সরকারি আশ্বাসে চিঁড়ে ভিজছে না সাধারণ মানুষের। বাগেরহাটের বাসিন্দা প্রহ্লাদ দে-র মতো অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, পাম্পে তেল না পাওয়া গেলেও খোলা বাজারে চড়া দামে তেল মিলছে। এক শ্রেণির ‘মৌসুমি ব্যবসায়ী’ সারাদিন বাইক নিয়ে বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে এলাকায় ২২০-২৫০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করছে।
রাজশাহীর প্রাইভেটকার চালক আব্দুল কাদেরের অভিযোগ, পাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা নেই। প্রভাব খাটিয়ে বা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে অনেকে সিরিয়াল ভেঙে তেল নিয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ রোদে পুড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছে।
কেন কাজ করছে না সরকারি ব্যবস্থা?
পরিস্থিতি সামলাতে সরকার নয় হাজারের বেশি অভিযান চালিয়েছে, জরিমানা করেছে কোটি টাকার ওপর, এমনকি ৪৫ জনকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবুও অস্থিরতা থামছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটা কেবল সরবরাহের নয়, বরং ‘আস্থার সংকটের’।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, সরকারের দেওয়া তথ্যের ওপর মানুষ ভরসা রাখতে পারছে না বলেই প্যানিক বাইং বাড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম প্রশ্ন তুলেছেন সরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তার মতে, বড় কোনো দুর্যোগ না থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে?
সমাধান কোন পথে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল মজুত বাড়ালেই হবে না, বাজার মনিটরিংয়ে স্বচ্ছতা আনতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব রুখতে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে সরকারকে আরও সক্রিয় ও কৌশলী হতে হবে। নতুবা ‘রেকর্ড মজুত’ কেবল কাগজের সংখ্যা হয়েই থাকবে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।
আরও পড়ুন:
ইস্টার্ন রিফাইনারি তীব্র সংকটে: তেল শোধনাগারের ভবিষ্যৎ কী?
বাড়ল এলপিজি সিলিন্ডারের দাম: পকেটে টান সাধারণ মানুষের।





