পদক কমলেও এ কোন ইতিহাস গড়ল ভারত? গ্লাসগোর ময়দানে ভারতের এই অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প চমকে দেবে আপনাকে!

গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের পর্দা নেমেছে এবং পদক-তালিকার দিকে চোখ রাখলে প্রথমটায় সামান্য ধাক্কা লাগতে পারে। এবারের আসরে মাত্র ৩৯টি পদক নিয়ে দেশে ফিরছে ভারতীয় দল, যার মধ্যে রয়েছে ১৩টি সোনা, ১৭টি রুপো এবং ৯টি ব্রোঞ্জ। ১৯৯৮ সালের কুয়ালালামপুর গেমসের পর এই প্রথম ভারতের পদক সংখ্যা ৫০-এর নিচে নেমেছে। পরিসংখ্যানের খাতা বলছে, গত ২৪ বছরে এটিই দেশের সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স। কিন্তু স্রেফ খেতাবি বা পদকের সংখ্যা দিয়ে গ্লাসগোর সামগ্রিক পারফরম্যান্সের বিচার করলে আসল এবং গৌরবের ছবিটা সম্পূর্ণ আড়ালেই থেকে যাবে।
আসলে এবারের গেমস ভারতের কাছে কোনো গতানুগতিক প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর এক রক্তক্ষয়ী লড়াই। খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন খেলার আঙিনায় নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ভারত। এবারের গ্লাসগো গেমস আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাজেট কাটছাঁটের তীব্র প্রভাব পড়েছিল সরাসরি ক্রীড়াসূচিতে। যেখানে গত বার্মিংহাম গেমসে মোট ১৯টি ভিন্ন ফরম্যাট বা খেলা ছিল, সেখানে গ্লাসগোতে তা কমিয়ে মাত্র ১০টিতে নামিয়ে আনা হয়। আর এই বড়সড় কাটছাঁটেই সরাসরি কোপ পড়ে ভারতের নিশ্চিত পদকের খনিগুলোর ওপর।
বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, শুটিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস এবং ফিল্ড হকি—এই পাঁচটি অত্যন্ত শক্তিশালী খেলা গ্লাসগোর মূল আসর থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছিল। ক্রিকেটপ্রেমী ও ক্রীড়াপ্রেমীরা জানেন যে ইতিহাস বরাবরই এই খেলাগুলি থেকে ভারতকে যথাক্রমে ১৩৫, ১১৪, ৩১, ২৮ এবং ৬টি পদক উপহার দিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, ২০২২ সালের বার্মিংহাম গেমসে ভারতের মোট ৬১টি পদকের মধ্যে একাই ৩০টি পদক এসেছিল এই পাঁচ বিভাগ থেকে, যার মধ্যে ১৩টি ছিল কেবল সোনা। ফলে গেমসের ময়দানে নামার আগেই ভারত তাদের ঐতিহ্যগত শক্তির বড় জায়গাগুলি চিরতরে হারিয়ে বসেছিল। কিন্তু এই বিরাট ধাক্কা সামলে মুষড়ে পড়ার বদলে সম্পূর্ণ নতুন উদ্যমে অন্য খেলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারতীয় দল।
পরিচিত ইভেন্টগুলি একে একে কেড়ে নেওয়ায় ভারতীয় অ্যাথলেটরা বাকি খেলাগুলির ওপর বাড়তি জোর দেন এবং তার ফলও মেলে একেবারে হাতেনাতে। স্বাগতিক দেশ স্কটল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে ৩৯টি পদকে সমতা অর্জন করলেও, ভারত বেশি সংখ্যক রুপো জেতার সুবাদে পদক তালিকার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ চতুর্থ স্থানটি নিজেদের দখলে রাখে। সামনে কেবল মহাশক্তিধর অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং কানাডা। মাত্র ১০টি মাত্র খেলায় অংশ নিয়ে ভারতের পদকের ঘনত্ব বা ডেনসিটি রেট দাঁড়িয়েছে বিস্ময়কর ৩.৯০-এ। অর্থাৎ, প্রতিটি ইভেন্ট থেকে গড়ে প্রায় ৪টি করে পদক তুলে নিয়েছে দেশ। কমনওয়েলথ গেমসের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই সাফল্যের হার রীতিমতো নজিরবিহীন ও চমকপ্রদ।
বিশেষ করে বক্সিং রিংয়ে এবার আক্ষরিক অর্থেই এক অভাবনীয় ইতিহাস গড়েছে ভারত। ১৪ জন বক্সারের সুসংগঠিত দল থেকে একাই এসেছে ১০টি পদক, যার মধ্যে ৭টি সোনা এবং ৩টি রুপো। মহিলা বক্সারদের জাদুকরী দাপট ছিল সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। প্রীতি পাওয়ার, জেসমিন লাম্বোরিয়া, সাক্ষী চৌধরি, প্রিয়া ঘঙ্ঘাস এবং অরুন্ধতী চৌধরি—এই পাঁচজন নারী তুর্কিই স্বমহিমায় সোনা জিতেছেন। পাশাপাশি পুরুষদের বিভাগে সচিন সিওয়াচ এবং অঙ্কুশ পাঙ্ঘালও সোনার মেডেল নিজেদের গলায় ঝুলিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। কমনওয়েলথ গেমসের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বক্সিংয়ে অন্য কোনো দেশের এমন একাধিপত্য আগে কখনও দেখা যায়নি।
সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা দারুণভাবে বজায় ছিল জুডোর ম্যাটেও। হর্ষ সিং এবং অস্মিতা দে এবারই প্রথম ভারতকে জুডোতে সোনার পদক এনে দিয়েছেন। এ ছাড়া যামিনী মৌর্য রুপো এবং উন্নতি শর্মা ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছেন। সব মিলিয়ে জুডোর ইতিহাসে এটিই ভারতের সর্বকালের সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে নথিভুক্ত হলো। অন্যদিকে, ট্র্যাক, ফিল্ড ও ভারোত্তোলনের মঞ্চেও রচিত হয়েছে নতুন দিগন্ত। অ্যাথলেটিক্স এবং প্যারা-অ্যাথলেটিক্স মিলিয়ে মোট ১৬টি পদক এসেছে। পুরুষদের জ্যাভলিনে রুপো জিতেছেন দেশের গর্ব নীরজ চোপড়া। ট্র্যাকের কঠিন লড়াইয়ে ইতিহাস গড়েছেন গুলবীর সিং, যিনি ১০০০০ মিটারে রুপো এবং ৫০০০ মিটারে ব্রোঞ্জ পদক নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন।
একক কোনো গেমসে ট্র্যাকের ইভেন্টে জোড়া পদক জয়ের এমন গৌরবময় নজির দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এই প্রথম। পাশাপাশি ডেক্যাথলনে ব্রোঞ্জ পদক জিতে দারুণভাবে খাতা খুলেছেন তেজস্বিন শংকর। প্যারা-অ্যাথলিটদের আগুনে পারফরম্যান্সও ছিল দেখার মতো। শর্মিলা ধনকর, দিলীপ মহাদু গাভিট এবং সোমন রানার দুর্দান্ত সোনার দৌলতে এই বিভাগ থেকে এসেছে মোট ৭টি সোনা। অন্যদিকে, ভারোত্তোলনের চিরপরিচিত মঞ্চে মীরাবাঈ চানুর অদম্য দাপট আজও অব্যাহত রয়েছে। ৪৮ কেজি বিভাগে টানা তৃতীয়বারের মতো সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন এই অলিম্পিক পদকজয়ী ভারোত্তোলক। সঙ্গে ভারোত্তোলকদের দলগত সম্মিলিত চেষ্টায় এসেছে আরও ৬টি রুপো এবং ১টি ব্রোঞ্জ।
সংখ্যার নিরিখে ৩৯ সংখ্যাটি হয়তো গত ২৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট অঙ্কের পদক সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের প্রেক্ষাপট ও কাঠিন্য বিচার করলে এর তাৎপর্য বিশাল। চেনা মাঠ এবং চেনা খেলাগুলো জোর করে কেড়ে নেওয়ার পরেও ভারত খাদের কিনারা থেকে বীরের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অপ্রধান খেলাগুলিতে নিজেদের সেরার সিংহাসনে বসিয়ে প্রমাণ করেছে যে ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে জানে। গ্লাসগোর এই অসাধারণ সাফল্য আগামী দিনের সমস্ত আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ইভেন্টে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রের এক নতুন পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেল।