২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি আসতেই ভারতের আবহাওয়া মানচিত্রে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল। একদিকে যখন আন্দামান ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বর্ষা বা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর আগমনের জন্য পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনুকূল হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই মূল ভূখণ্ডে বর্ষার প্রবেশ নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD)। আবহাওয়াবিদদের স্পষ্ট বার্তা, চলতি বছরের ১৬ মে-র মধ্যেই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু আন্দামান সাগর, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে আছড়ে পড়তে চলেছে। শুধু তাই নয়, কেরালায় এবার নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা আগেই বর্ষার এন্ট্রি হতে পারে। আগামী ২৬ মে কেরালায় মৌসুমী বায়ু প্রবেশের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণত কেরালায় বর্ষা নামার ‘স্বাভাবিক’ তারিখ হলো ১ জুন।
তবে এই আগাম বর্ষার খুশির খবরের মাঝেই ধেয়ে আসছে এক মহাবিপদ। আইএমডি এবং বেসরকারি আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা ‘স্কাইমেট ওয়েদার সার্ভিসেস’—উভয়েই একযোগে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দিয়েছে। আলিপুর ও দিল্লির আবহাওয়াবিদদের যৌথ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর মরসুমটি সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কিছুটা দুর্বল হতে পারে। আর এর পেছনে মূল ভিলেন বা উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে আসছে ‘এল নিনো’-র সক্রিয়তা। প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশির এই অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন বা এল নিনো ভারতের সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চরিত্রকে তছনছ করে দিতে পারে। সাধারণত এল নিনোর প্রভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ একধাক্কায় অনেকটাই হ্রাস পায়। এর ফলে দেশের ফসল উৎপাদন, পানীয় জলের প্রাপ্যতা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন—সবকিছুই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে আগাম বর্ষা এলেও জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বৃষ্টিপাত কতটা ধারাবাহিক থাকবে, তা নিয়ে দেশের কৃষি ও অর্থনীতি মহলে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের মূল ভূখণ্ডের বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতির দিকে নজর রাখলে দেখা যাচ্ছে, এক জোড়া ঘূর্ণাবর্ত ও শক্তিশালী নিম্নচাপের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলা জুড়েই এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর থেকে হু হু করে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প দেশের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। একটি শক্তিশালী পূর্ব-পশ্চিম অক্ষরেখা বর্তমানে মধ্যপ্রদেশ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সিকিম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর পাশাপাশি, পূর্ব বাংলাদেশ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্ত দানা বেঁধেছে। আবার দক্ষিণ-পশ্চিম এবং সংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের উপর একটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপ অবস্থান করছে। যদিও এই নিম্নচাপটি পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকাগুলিতে সরাসরি কোনও প্রভাব ফেলবে না, তবে এর পরোক্ষ প্রভাবে উত্তরবঙ্গে দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হয়েছে।
রবিবার থেকে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, কালিম্পং এবং আলিপুরদুয়ারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বৃষ্টির পাশাপাশি এই জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে প্রবল দমকা হাওয়া বা ঝড় বইবে। উত্তরবঙ্গে যখন বৃষ্টির তাণ্ডব চলবে, তখন দক্ষিণবঙ্গের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হবে। এই মুহূর্তে কলকাতায় ভারী বৃষ্টির কোনও পূর্বাভাস নেই। তবে রবিবার নাগাদ পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ায় তীব্র ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখীর মতো প্রবল বাতাস বইতে পারে। তবে এই সাময়িক স্বস্তির পর, আগামী দুই দিনে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে পারদ আরও চড়বে এবং তাপমাত্রা তিন থেকে চার ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আইএমডি জানিয়েছে, দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে স্বাভাবিকের আগেই বৃষ্টি শুরু হলেও, বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলির আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা।





