টিভি মেকানিক থেকে বিধায়ক, আর তারপরই রাজপ্রাসাদসম অট্টালিকার মালিক। রূপকথার গল্পের মতো উত্থান হলেও, পতন হলো বড়ই করুণ। পূর্ব বর্ধমানের কালনার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক দেবপ্রসাদ বাগ অবশেষে ধরা পড়লেন পুলিশের জালে। ত্রাণ-দুর্নীতির তদন্তে সোমবার মধ্যরাতে পুলিশের হানা এবং তার পরেই দেবপ্রসাদ বাগের গ্রেপ্তারির ঘটনা ঘিরে তোলপাড় গোটা রাজ্য।
তৃণমূল কংগ্রেসের একদা দাপুটে এই নেতার জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত। টিভি মেকানিক হিসেবে জীবন শুরু করা দেবপ্রসাদ কয়েক বছরের মধ্যেই বিধায়ক পদে আসীন হন। তারপরই শুরু হয় তাঁর বিপুল ঐশ্বর্যের পাহাড় গড়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের বয়ানে উঠে আসছে তাঁর রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ, তাঁর বিলাসবহুল বাড়ির অন্দরসজ্জা থেকে শুরু করে গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড কুঠুরি—সবই ছিল রহস্যে মোড়া। সেই গোপন কুঠুরিতে কী চলত, তা নিয়ে এখন স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র কৌতূহল ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ত্রাণ-দুর্নীতির তদন্তে নেমে সিআইডি এবং স্থানীয় পুলিশ আগেই তৃণমূলের ব্লক সভাপতি প্রণব রায়কে গ্রেপ্তার করেছিল। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই সোমবার রাতে দেবপ্রসাদ বাগের বাড়িতে হাজির হয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিশাল দল। ধৃত প্রণব রায়কে সঙ্গে নিয়েই পুলিশ যখন বিধায়কের বাড়ির সামনে পৌঁছায়, তখন দেখা যায় মূল ফটকে তালা ঝুলছে। পুলিশের কাছে গোয়েন্দা মারফত গোপন খবর ছিল, প্রাক্তন বিধায়ক হুগলির দিকে গা-ঢাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
পুলিশ যখন বাড়ির বাইরে অবস্থান করছে, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িটি চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। বিধায়কের বিরুদ্ধে ‘চোর’ স্লোগান দিয়ে এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন সাধারণ মানুষ। সারারাত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারায় বাড়ির বাইরেই অবস্থান করে। শেষপর্যন্ত সব ছক ব্যর্থ করে পুলিশের জালে ধরা পড়েন দেবপ্রসাদ বাগ। গ্রেপ্তারির সময় তাঁর ফিল্মি কায়দায় গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
বর্তমানে কালনা থানার পুলিশ প্রাক্তন বিধায়ককে হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জেরা চালাচ্ছে। সূত্রের খবর, ধৃত তৃণমূল ব্লক সভাপতি প্রণব রায় এবং দেবপ্রসাদ বাগকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার পরিকল্পনা করছে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, এই ত্রাণ-দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে এবং এই দুর্নীতির বিপুল অর্থ কোথায় গচ্ছিত আছে, তার খোঁজে প্রাক্তন বিধায়কের বাড়ি ও গোপন কুঠুরিগুলিতে ফের তল্লাশি চালানো হতে পারে।
টিভি মেকানিক থেকে এক বিধায়কের এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার বিষয়টি এখন সাধারণ মানুষের কাছে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এই তদন্তে কাউকেই রেয়াত করা হবে না। দেবপ্রসাদ বাগের এই গ্রেপ্তারি শাসকদলের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে ভোটের আগে যখন ত্রাণ-দুর্নীতির মতো ইস্যুতে তৃণমূল কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এখন পুলিশি জেরায় প্রাক্তন বিধায়ক আর কোন কোন তথ্য ফাঁস করেন, তার দিকেই তাকিয়ে আছে রাজ্যবাসী।





