দেশের বিচার ব্যবস্থার গরিমা এবং আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে এবার সুপ্রিম কোর্টে নজিরবিহীন ক্ষোভ ও কঠোর অবস্থান দেখা গেল। সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেশের আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত কিছু বেকার যুবকের একাংশকে সরাসরি “আরশোলা” এবং “পরজীবী”-র সঙ্গে তুলনা করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য এবং কড়া অবস্থানকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশের আইনি মহল তথা জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, দিল্লি হাইকোর্টে একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছিলেন এক আইনজীবী। সেই আবেদন সংক্রান্ত মামলাটিই সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সঙ্গে গঠিত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে। শুনানি চলাকালীনই ওই আবেদনকারী আইনজীবীর ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। তিনি সরাসরি এজলাসেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “সমাজে ইতিমধ্যেই এমন কিছু পরজীবী রয়েছে যারা বিচার ব্যবস্থার ওপর অনবরত আঘাত হেনে চলেছে। আর আপনি কি একজন আইনজীবী হয়েও তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে চান?”
এখানেই শেষ নয়, তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত আরও বলেন, “কিছু যুবক রয়েছে যারা আসলে আরশোলার মতো। তারা আইন পাস করেও কোনো কাজ পায় না, এই মহান পেশায় তাদের কোনো স্থান নেই।” এরপরই সামাজিক মাধ্যম ও তথাকথিত কিছু কর্মীর ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট জানান, “কাজ না পেয়ে এই যুবকদের কেউ কেউ মিডিয়া সেজে বসে, কেউ সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, আবার কেউ কেউ আরটিআই (RTI) কর্মী সেজে সবাইকে এবং গোটা ব্যবস্থাকে আক্রমণ করা শুরু করে। আর আপনারা সেইসব মানুষদের হয়ে এই ধরনের তুচ্ছ অবমাননা পিটিশন দাখিল করতে চলে আসেন!”
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয় যে, বিচারপতিরা “ব্যবস্থার বিরুদ্ধে” করা সামাজিক মাধ্যমের সমস্ত কুৎসিত পোস্ট এবং গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। সমাজে বিচার বিভাগকে অনবরত আক্রমণকারী পরজীবীদের সঙ্গে আইনজীবীদের হাত না মেলানোর জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। আদালত স্পষ্ট জানায়, এই ধরনের কাজ দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য এক মস্ত বড় হুমকিস্বরূপ।
শুনানির সময়েই দেশে বিপুল সংখ্যক ভুয়ো এবং নকল আইনের ডিগ্রি থাকার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI) এই বিষয়ে কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাই সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এই জাল ডিগ্রি চক্রের রহস্যভেদে সিবিআই (CBI)-কে দিয়ে পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই ও তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
আবেদনকারী আইনজীবী যখন এজলাসকে জানান যে, এটি তৃতীয়বার যখন তিনি এই একই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন, তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, দিল্লি হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের পূর্বের নির্দেশ মেনে আবেদনগুলি দ্রুত পুনর্বিবেচনা করেনি। যদিও হাইকোর্টের পক্ষে উপস্থিত সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাজশেখর রাও এজলাসকে জানান যে, সিনিয়র পদমর্যাদা নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া বর্তমানে পুরোদমে চলছে।
সব শোনার পর আবেদনকারীর প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সরাসরি রায় দেন, “সমগ্র বিশ্ব হয়তো সিনিয়র পদমর্যাদার যোগ্য হতে পারে, কিন্তু অন্তত আপনি নন। আপনার পেশাগত আচরণ দেখে হাইকোর্ট যদি আপনাকে কোনোদিন সিনিয়র করেও দেয়, তবে আমরা সুপ্রিম কোর্ট থেকে তা বাতিল করে দেব।” একই সঙ্গে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, “আপনার কি আর কোনো মামলা করার মতো কাজ নেই? এটি কি এমন একজন ব্যক্তির অবস্থান হতে পারে, যিনি সিনিয়র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা রাখেন?” এরপরই সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ আবেদনটিকে সম্পূর্ণ “তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন” আখ্যা দিয়ে খারিজ করার নির্দেশ দেয়। বেগতিক দেখে ওই আইনজীবী তাৎক্ষণিকভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদনটি প্রত্যাহারের অনুমতি চাইলে, আদালত তাতে সম্মতি জানায়।





