SRFTI-তে ভয়াবহ তাণ্ডব! ছুরি-রড হাতে ক্যাম্পাসে হামলা, ৩টি FIR দায়ের থানায়

রবিবার সন্ধ্যা থেকে দফায় দফায় ভয়াবহ সংঘর্ষ ও রণক্ষেত্রের রূপ নিল সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)। প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ধরে চলা এই তাণ্ডবে কার্যত উত্তাল হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই পঞ্চসায়র থানায় তিনটি পৃথক এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা দায়ের করেছে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত সমিতি (ABGP), দ্বিতীয়টি SRFTI-র ছাত্রছাত্রীদের একাংশ এবং তৃতীয়টি পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুজু করেছে। তবে এত বড় ঘটনার পরেও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ঠিক কী ঘটেছিল ক্যাম্পাসে?
রবিবার দুপুরে SRFTI-র মূল প্রেক্ষাগৃহে আরএসএস (RSS) ঘনিষ্ঠ সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেই অনুষ্ঠান চলাকালীনই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আয়োজকদের কথা কাটাকাটি চরমে ওঠে। অভিযোগ ওঠে, আচমকাই ছুরি ও লোহার রড হাতে কিছু বহিরাগত ক্যাম্পাসে ঢুকে চড়াও হয় এবং পুরো শিক্ষাঙ্গন ঘিরে ফেলে।
ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় ইটের আঘাতে এক শিক্ষার্থী গুরুতর জখম হন এবং ছাত্রীদের ওপরও চড়াও হয়ে মারধর করা হয়। স্থানীয় বিজেপি কর্মীরাও ক্যাম্পাসের বাইরে চত্বর ঘিরে ফেলে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। পরিস্থিতি বেসামাল বুঝে শিক্ষকদের অনেকেই ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসেন।
অন্যদিকে, পাল্টা দাবি করেছে এবিভিপি ও এবিজিপি (ABGP) ঘনিষ্ঠ শিবির। তাদের দাবি, সংঘর্ষে তাদেরও পাঁচজন কর্মী আহত হয়েছেন। পড়ুয়ারা স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতমাতার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলায় উত্তেজনা ছড়িয়েছিল এবং তাদের পূর্বনির্ধারিত সভা জোর করে ভেস্তে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।
এরপর সংঘর্ষের জেরে অভিযুক্তরা একটি বাসে ওঠার চেষ্টা করলে ছাত্রছাত্রীরা সেই বাসটি ঘিরে ফেলে এবং ইট ছোড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। আহতদের নিয়ে সদস্যরা হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাতে বাধা দেওয়া হয়। কোন থানার অধীনে এই এলাকা পড়ে, তা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা কাটতে অনেকটা সময় নষ্ট হয়। ততক্ষণে সত্যজিৎ রায় ইনস্টিটিউটের চত্বর আক্ষরিক অর্থেই রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, “যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁরা প্রমাণ করলেন যে তাঁরা সনাতনী মানুষদের পরিপন্থী। বিবেকানন্দকে যাঁদের পছন্দ নয়, যাঁরা অস্ত্র হাতে মানুষ মেরে সংসদ দখল বা দেশকে টুকরো করার কথা বলেন, এই অরাজকতার উত্তর মানুষ দেবে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিতর এই তাণ্ডব কোনোভাবেই সভ্যতার লক্ষণ নয়।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে খুনের মামলাও রুজু হতে পারে।
পাল্টা তোপ দেগে এসএফআইয়ের (SFI) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, “এসআরএফটিআইতে যা চলছে, কোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে তা হতে পারে না।” বাম নেত্রী দীপ্সিতা ধর একে বিজেপির তাণ্ডব বলে অভিহিত করে বলেন, “বাংলার যা কিছু গর্বের, সেখানেই এই শকুনদের নজর।”
সিপিএম নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, “চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় সরাসরি আরএসএস মতাদর্শকে আক্রমণ করেছিলেন। আজ তাঁর স্মৃতিতে তৈরি গবেষণা কেন্দ্রটি আরএসএস-এর গো-সন্তানদের দ্বারা আক্রান্ত।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ ক্যাম্পাসে পৌঁছন নবনিযুক্ত উপাচার্য সন্তোষ আজমেরা। তিনি বলেন, “যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। এসআরএফটিআই দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান। ছাত্রছাত্রীরা আমাকে জানিয়েছেন তাঁরা হিংসায় ইন্ধন জোগায়নি। আমি শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়েই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।” কেন্দ্রীয় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তথা সাংসদ সুরেশ গোপীও পুরো ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই সংঘর্ষের ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।