JEE-NEET-এর গতানুগতিক ইঁদুরদৌড় নয়! ৩.৫৫ কোটি টাকার স্কলারশিপে মার্কিন মুলুকে ইতিহাস গড়ল ১৭ বছরের প্রণব

ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিসিন—স্কুলের গণ্ডি পেরোলেই দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা নিটের মতো কঠিন পরীক্ষার বৈতরণী পার করা। কিন্তু এই গতানুগতিক ভিড়ের স্রোতে না হেঁটে সম্পূর্ণ আলাদা এক পথ বেছে নিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তামিলনাড়ুর ১৭ বছরের কিশোর প্রণব ইলাঙ্গো। চিরাচরিত প্রথা ভেঙে পড়াশোনা, গবেষণা ও সমাজসেবাকে পাথেয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্বনামধন্য ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অর্জন করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রায় ৩.৫৫ কোটি টাকা (প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের একটি বিশাল সম্পূর্ণ বৃত্তি লাভ করেছেন এই তরুণ।
ভিন্নধর্মী পড়াশোনা ও শিক্ষাগত যাত্রা
তামিলনাড়ুর ইরোডের বাসিন্দা প্রণবের বাবা-মা দুজনেই পেশায় শিক্ষক। ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল ব্যতিক্রমী। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি চিরাচরিত সিবিএসই বোর্ডের বদলে কেমব্রিজ আইজিসিএসই (IGCSE) বোর্ড বেছে নেন। পরবর্তীতে এ-লেভেলের পড়াশোনাও কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। আইজিসিএসই-র সমস্ত ৯টি বিষয়েই সর্বোচ্চ A+ স্টার গ্রেড অর্জনের পাশাপাশি এ-লেভেলের ৬টি বিষয়েও দুর্দান্ত সাফল্য পান তিনি।
অষ্টম শ্রেণি থেকেই ‘ডেক্সটেরিটি গ্লোবাল’-এর মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হন প্রণব। এই বিশেষ প্রোগ্রামটি তাঁকে শুধু অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষা, ব্যক্তিগত বিকাশ এবং সমাজসেবামূলক কাজেও দারুণভাবে সাহায্য করে। এই পথ ধরেই তিনি বুঝতে পারেন যে বিদেশের নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য দারুণ বৃত্তির সুযোগ রয়েছে।
গণিত থেকে জনস্বাস্থ্য এবং ক্যানসার সচেতনতা
ছোটবেলা থেকেই গণিত ও পরিসংখ্যানের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল প্রণবের। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আগ্রহ ছড়ায় জনস্বাস্থ্য ও গবেষণার দিকে। একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি এক বন্ধুর হাত ধরে শুরু করেন ‘তামিলনাড়ু ক্যানসার পরিসংখ্যান প্রকল্প’। ক্যানসার সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে সেগুলোকে একটি ওয়েবসাইটে মানুষের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার এক অভিনব উদ্যোগ নেন তাঁরা।
শুধু তথ্য সংগ্রহেই থেমে থাকেননি প্রণব। ইরোড, কোয়েম্বাটুর সহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় নিজে গিয়ে ক্যানসার সচেতনতা অভিযান পরিচালনা করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করলে যে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়, তা সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচার করতে তামিল ভাষায় প্রচারপত্রও বিতরণ করেন তিনি। সমাজের প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
শুধু পড়াশোনা নয়, দাবায় আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিনিধিত্ব
প্রণবের প্রতিভা কেবল পাঠ্যবই বা গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়, খেলাধুলাতেও তিনি সমান পারদর্শী। প্রতিযোগিতামূলক দাবায় তাঁর ফিদে (FIDE) রেটিং প্রায় ১৮০০। শুধু তাই নয়, দাবার বোর্ডে দারুণ দক্ষতা দেখিয়ে তিনি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তামিলনাড়ুর প্রতিনিধিত্ব করার গৌরব অর্জন করেছেন।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে কী নিয়ে পড়াশোনা?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওপেন কারিকুলাম বা উন্মুক্ত পাঠ্যক্রমের সুবিধা নিয়ে প্রণব ফলিত গণিত ও জনস্বাস্থ্য একসঙ্গে নিয়ে পড়াশোনার পরিকল্পনা করেছেন। বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে আসতে চান এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে গবেষণার লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভারতের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান। অল্প বয়সেই প্রণবের এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও সাফল্য কেবল তাঁর পরিবারকেই নয়, সমগ্র দেশকে গর্বিত করেছে।