৬ বছর ধরে মিলছে না গ্র্যাচুইটির টাকা! জলপাইগুড়ি পুরসভায় ব্যারিকেড ভেঙে ঢুকে পড়লেন ক্ষুব্ধ সাফাইকর্মীরা

সংবাদ শিরোনামে উঠে আসা এক চরম ও চাঞ্চল্যকর প্রতিবাদের ঘটনায় এই মুহূর্তে উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহর। দীর্ঘ তিন মাস ধরে একটানা বকেয়া বেতন এবং নিয়মিত পেনশন না পাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সোজা পথে নেমে আন্দোলন শুরু করেছেন জলপাইগুড়ি পুরসভার শত শত অস্থায়ী সাফাইকর্মী। মঙ্গলবার সকাল থেকেই জলপাইগুড়ি পুরসভার প্রধান গেটের সামনে পচা ভাত ও শহরের নানা প্রান্তের জঞ্জাল-আবর্জনা ছিটিয়ে এক নজিরবিহীন ও নতু্ব ধরনের বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ক্ষুব্ধ সাফাইকর্মীরা। এই তীব্র অসন্তোষের জেরে পুরসভা চত্বরে এক যুদ্ধকালীন ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার সকালে, যখন জলপাইগুড়ি পুরসভার ৩১৬ জন অস্থায়ী সাফাইকর্মী তাঁদের বকেয়া পাওনা আদায়ের দাবিতে পুরসভা অভিযান চালান। সূত্রের খবর, জলপাইগুড়ি শহরের ২৫টি ওয়ার্ডের সাফাইয়ের মূল দায়িত্ব এই অস্থায়ী কর্মীদের কাঁধেই রয়েছে। অথচ মাসের পর মাস তাঁদের কোনো বেতন দেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ, এর আগেও একাধিকবার পুর কর্তৃপক্ষের কাছে বকেয়া বেতন, পেনশন ও গ্র্যাচুইটির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি নিয়ে বারবার আর্জি জানানো হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল মিথ্যে আশ্বাসই দেওয়া হয়েছে, কাজের কাজ কিচ্ছু হয়নি। এদিনের বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সোজা পুরসভার অন্দরে ঢুকে পড়েন।

আন্দোলনরত প্রবীণ সাফাইকর্মী প্রবীণ রাউত অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “আমাদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতনের সমস্যার পাশাপাশি পেনশনের বকেয়া এবং গ্র্যাচুইটির টাকা না পাওয়ার যন্ত্রণায় জর্জরিত হতে হচ্ছে। পুরসভাকে বারবার সমাধানের কথা জানানো হলেও চেয়ারম্যান মহাশয় আমাদের কোনো কথা শুনতে চাননি এবং কেবল মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের ঝুলিয়ে রেখেছেন। আজ বাধ্য হয়েই পেটের দায়ে আমাদের এই চরম পথ বেছে নিতে হয়েছে।” অপর এক প্রবীণ সাফাইকর্মী মদন রাউত আক্ষেপের সুরে জানান, “প্রায় ছয় বছর হতে চলল, আমি এখনও পর্যন্ত গ্র্যাচুইটির একটি কানাকড়িও পাইনি। নিয়মিত পেনশনও বন্ধ রয়েছে, যার জেরে আজ আমাদের না-খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। আমরা শুধু চাই আমাদের এই অমানবিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক।”

সাফাইকর্মী সংগঠনের সম্পাদক অভিষেক রাউত আরও জোরালো ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “বিগত দুই বছর ধরে পুরসভা কেবল আমাদের আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কাজের বেলায় শূন্য। যাঁরা পেনশন পাওয়ার যোগ্য, তাঁরাও নিয়মিত পেনশন পাচ্ছেন না। জলপাইগুড়ির সমস্ত নোংরা ও আবর্জনা সাফ করে শহরকে যারা ঝকঝকে রাখছে, সেই মানুষগুলোর ভালো-মন্দের দিকটা দেখার কেউ নেই। আমাদের পানীয় জলের সংযোগ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর যদি অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে আমরা আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব এবং প্রয়োজনে জাতীয় সড়ক অবরোধ করব।”

এদিকে এই গোটা বঞ্চনা ও বিক্ষোভের ঘটনা প্রসঙ্গে জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান সৈকত চট্টোপাধ্যায় সাফাই দিয়ে জানিয়েছেন, “তিন মাস ধরে সাফাইকর্মীরা বেতন পাচ্ছেন না বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। জলপাইগুড়ি পুরসভার সাফাইকর্মীদের চলতি মাসের বেতন খুব শীঘ্রই দিয়ে দেওয়া হবে। আর পেনশনের বিষয়টি পুরোপুরি রাজ্য সরকারের অনুদান ও অনুমোদনের উপর নির্ভর করছে। আমাদের পুরসভার তরফ থেকে রাজ্য সরকারের কাছে এখনও প্রায় ২ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে, তারা যখনই ওই বকেয়া তহবিল ছাড় করবে, আমরা ধীরে ধীরে সমস্ত সাফাইকর্মীদের বকেয়া পেনশন মিটিয়ে দিতে শুরু করব। এই বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমি স্বীকার করছি যে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবে খুব শীঘ্রই বেতন ও পেনশনের এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। এভাবে পুরসভার সামনে পচা ভাত ও আবর্জনা ফেলে বিক্ষোভ প্রদর্শনের কোনো মানেই হয় না।”