৫১ শক্তিপীঠের তালিকায় কি নাম আছে তারাপীঠের? জানুন তন্ত্রসাধনার এই পবিত্র তীর্থের অজানা সত্য

তারাপীঠ মানেই ভক্তি, বিশ্বাস, তন্ত্রসাধনা আর আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। বীরভূমের এই পবিত্র ভূমিতে দেবী এখানে মা তারা রূপে অধিষ্ঠিত—যিনি দশমহাবিদ্যা দ্বিতীয় রূপ। দ্বারকা নদীর তীরে শ্বেত শিমূল বৃক্ষের তলায় পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে এখানেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বাংলার প্রবাদপ্রতিম সাধক বামাক্ষ্যাপা। কিন্তু বশিষ্ঠ মুনি কেন সাধনার জন্য তারাপীঠকে বেছে নিয়েছিলেন? আর ৫১ শক্তিপীঠের সঙ্গে এর আসল যোগসূত্রটাই বা কী?

বশিষ্ঠ মুনির সাধনা ও চিনের ‘পঞ্চমকার’ তত্ত্ব

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, ব্রহ্মার সপ্তম মানস পুত্র তথা সপ্তর্ষিদের একজন ছিলেন বশিষ্ঠ মুনি। দ্বিতীয় মহাবিদ্যা তারা বা নীল সরস্বতীর সাধনায় ব্রতী হন তিনি। বাকশক্তিপ্রদায়িনী দেবী তারা নীলবর্ণা, লোলজিহ্বা, করালবদনা এবং চতুর্ভুজা। তাঁর পরনে থাকে ব্যাঘ্রচর্ম। দেবীর দেখা পেতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেও যখন বশিষ্ঠের সাধনা সফল হচ্ছিল না, তখন তিনি এক দৈববাণী পান। এরপর চিন দেশে গিয়ে তিনি তারার ‘পঞ্চমকার’ বা সাধন তত্ত্বের (মদ, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন) জ্ঞান লাভ করেন।

এরপর বীরভূমের তারাপুর গ্রামের শ্মশান সংলগ্ন স্থানে দীর্ঘকাল মাতৃ তপস্যায় বসেন বশিষ্ঠ। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে উজ্জ্বল জ্যোতি স্বরূপে দর্শন দেন এবং বর চাইতে বলেন। মাতৃগর্ভে জন্ম না হওয়া ‘অযোনিসম্ভূত’ বশিষ্ঠ দেবীকে মাতৃরূপে দেখার প্রার্থনা করলে, দেবী তাঁকে সমুদ্রমন্থনকালে শিবকে গরলমুক্ত করার সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করান। ভীষণ বিপদ থেকে শিবকে রক্ষা করার কারণেই তিনি বিশ্বে ‘তারিণী’ রূপে খ্যাত হন। আর সেই রূপই শিলাখণ্ড রূপে প্রকট হয়, যা আজ তারাপীঠের ‘ব্রহ্ম শিলা’ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে মল্লারপুরের জমিদার জগন্নাথ রায় এখানে বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

বশিষ্ঠের বর ও সিদ্ধপীঠের মাহাত্ম্য

বশিষ্ঠ মুনির কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মা তারা আশীর্বাদ করেছিলেন, তারাপীঠে সিদ্ধিলাভ করার পর আর কাউকে এত কঠিন সাধনা করতে হবে না। এই মহাপীঠে যে কোনো সাধক মাত্র এক লক্ষ জপেই তারা মন্ত্রে সিদ্ধি লাভ করতে পারবেন। যুগে যুগে তাই বামদেব সহ অজস্র সাধক এই মহাশ্মশানে ছুটে এসেছেন সিদ্ধিলাভ করতে। সেই কারণেই তারাপীঠ একটি সুপ্রসিদ্ধ ‘সিদ্ধপীঠ’।

তারাপীঠ কি আদৌ ৫১ শক্তিপীঠের একটি?

সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে তারাপীঠ বোধহয় ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম, যেখানে সতীর অক্ষিগোলক বা চোখের তারা পড়েছিল। কিন্তু শাস্ত্র বলছে অন্য কথা। সতী দেহত্যাগের পর মহেশ্বর যখন তাঁর দেহ কাঁধে নিয়ে ত্রিভুবন ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ৫১ খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে ‘পীঠ নির্ণয় তন্ত্র’, ‘তন্ত্র চূড়ামণি’, ‘শিবচরিত’ কিংবা ‘দেবী ভাগবত’—কোথাও ৫১ পীঠের তালিকায় তারাপীঠের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। সতীত্রিনয়ন তারাপীঠে পতিত হয়েছিল এমন কোনো শাস্ত্রীয় প্রামাণ্য নথিও নেই। তাই ভক্তদের মনে গভীর আস্থা ও মাহাত্ম্য থাকলেও, শাস্ত্রীয় বিচারে তারাপীঠ কোনো ‘শক্তিপীঠ’ নয়, বরং এটি তন্ত্রসাধনার এক অনন্য ‘সিদ্ধপীঠ’।