২১ জুলাইয়ের চেনা ছবি অতীত! ক্ষমতা হারাতেই চরম ভাঙন ও ছন্নছাড়া দশায় তৃণমূল, শহরের বুকে এ কোন অচেনা দৃশ্য?

আজকের শহর কলকাতা সাক্ষী থাকল এক সম্পূর্ণ অচেনা এবং অভূতপূর্ব ২১ জুলাইয়ের, যা বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় এই প্রথমবার রাজ্যের শাসকদল বা তৃণমূল কংগ্রেসের ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের চিরচেনা চিত্রটি পুরোপুরি বদলে গেছে। অতীতে এই বিশেষ দিনটিতে প্রতি বছর ধর্মতলার মেয়ো রোড কিংবা ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে মমতার দলের পক্ষ থেকে এক ঐতিহাসিক ও বিশাল জনসমুদ্রের সৃষ্টি করা হতো। এমনকি উৎসবের মেজাজে রাজ্যের দূরদূরান্তের জেলাগুলো থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা একদিন আগে থেকেই রাজধানী কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তের মাঠে, ঘাটে, রাজপথে এবং আশ্রয়স্থলগুলোতে এসে ভিড় জমাতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল এবং নির্বাচনে বড় ধরণের বিপর্যয়ের পর বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে চরম অস্থিরতা ও ছন্নছাড়া ভাব তৈরি হয়েছে, তার চরম প্রভাব আজ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ল মহানগরীর রাজপথে।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ ও সমন্বয় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। দলের শীর্ষ স্তরের চরম কোন্দল এবং আস্থার সঙ্কটের কারণে এবছর দলীয় নেতৃত্ব কোনো এক ছাতার নিচে একত্রিত হয়ে যৌথভাবে শহিদ দিবস পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরিবর্তে শাসক শিবিরের ভেতরে থাকা দুটি প্রভাবশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির নিজেদের মতো করে সম্পূর্ণ পৃথক স্থানে ও আলাদা আয়োজনে শহিদ দিবসের আনুষ্ঠানিকতা সারছে। শুধু শাসকদলের অন্দরের এই নজিরবিহীন দ্বিখণ্ডিত অবস্থাই নয়, বরং বিরোধী শিবির তথা কংগ্রেস দলও এই ঐতিহাসিক দিনটিতে কোনো যৌথ বা বৃহৎ জোটের পথে না হেঁটে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্রভাবে নিজস্ব কর্মসূচি পালন করেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ আজ কোনো একক শক্তির প্রদর্শন না হয়ে বরং রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনৈক্য এবং ভাঙনের এক স্পষ্ট আয়নায় পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বহু বছর ধরে ২১ জুলাইয়ের দিনটিকে কেন্দ্র করে যে বিপুল রাজনৈতিক শক্তি ও পেশিশক্তির প্রদর্শনী তিলোত্তমা কলকাতায় দেখা যেত, আজকের এই নিস্পৃহ ও বিভক্ত দৃশ্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যেমন এক ধরণের হতাশা ও নিষ্ক্রিয়তা কাজ করছে, ঠিক তেমনই শীর্ষ নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব এই বিপর্যয়কে আরও বেশি ত্বরান্বিত করেছে। একে তো দীর্ঘকালীন ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে যাওয়ার যন্ত্রণা, অন্যদিকে দলের অন্দরে ক্ষমতার দখল নেওয়ার অন্তহীন লড়াই—সব মিলিয়ে ঘাসফুল শিবিরের এই করুণ দশা আজ রাজনৈতিক মহলে এক প্রবল আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সকলেই একবাকয়ে স্বীকার করছেন যে, আজকের এই অচেনা ও বিবর্ণ ২১ জুলাই বাংলার রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন এবং পতনকেই অতি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।