“১০ বছর বয়সে ব্রিটিশদের কানমলা খেয়েছিলেন!”-স্বাধীনতার লড়াইয়ের গল্প শোনালেন ৯৩-এর বিপ্লবী

সময়টা তখন উত্তাল। ঘরে ঘরে বাজছে স্বাধীনতার রণডঙ্কা। বাচ্চা থেকে বুড়ো— ব্রিটিশ শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র জপ করে চলেছেন দিন-রাত। তেমনই এক রাতে হাওড়ার প্রত্যন্ত এলাকার একটি গলিতে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বগলে একতোড়া পোস্টার নিয়ে এক বছর দশেকের কিশোর একটার পর একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি পোস্টার সাঁটিয়ে ফের সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই গলির সামনেটা এসে পড়ল একটি জিপের জোরালো হলুদ আলো। বুটের খটখট শব্দে পাড়ার নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার।

এক হাবিলদার টর্চের আলোটা ফেলল সোজা ওই কিশোরের মুখে। পাশ থেকে এক ব্রিটিশ অফিসার কর্কশ শব্দে চিৎকার করে ওঠেন। গা-হাত, পা ততক্ষণে অবশ হয়ে গিয়েছে সেই কিশোরের। ভয়কে চেপে রেখেই ছেলেটি আলতো গলায় বলে, ‘পোস্টার মারছি…’ ততক্ষণে ওই অফিসার এসে কিশোরের কানটা টেনে ধরেছেন। রাগে গোটা শরীর জ্বলে গিয়েছিল সেই কিশোরের। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল, ‘ব্রিটিশদের ভারত ছাড়া করবই।’

বাবা-দাদাকে প্রতিদিনই দেখেছেন স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রাণ বাজি রাখতে। দেশমাতৃকার প্রতি কর্তব্য সেই ছোট থেকেই শিখে নিয়েছিলেন গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়। ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির কাজ শুরু করে দেন তিনি। বিভিন্ন বিপ্লবী দলের কাছে গুপ্ত খবর পাঠানোর কাজ করে গিয়েছেন নিয়মিত। স্বাধীনতা লাভের ৮০ বছর পরে এসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সেই জীবন্ত দলিল গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় ডেইলিমার্ট-এর পাঠকদের কাছে তুলে ধরলেন তাঁর জীবনের সংগ্রামী ইতিহাসের কথা।

ছোট থেকেই দেশাত্মবোধের দীক্ষা

হাওড়ার আমতা এলাকায় আদি বাড়ি হলেও বর্তমানে তিনি হুগলির বলাগাবাদে থাকেন। গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা জয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। জেঠতুতো দাদা ঘনশ্যামের হাত ধরেই মূলত স্বদেশী আন্দোলনে পা রাখেন গুণধর। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে পাঠশালায় পড়ার সময়েই তিনি যুক্ত হয়ে যান নানা গোপন কাজকর্মের সঙ্গে। মেদিনীপুর থেকে পাঠশালায় পড়াতে আসা শিক্ষক সত্য ও বিমানবাবুর ২০ জন ছাত্রকে নিয়ে গড়া বিশেষ দলের সদস্য ছিলেন তিনি।

রাতে দোকানে ও সরকারি অফিসে ‘হরতাল’ লেখা পোস্টার সাঁটানোর অপরাধে একবার ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে ৬ টাকা ২৫ পয়সা জরিমানাও করেছিল। হুগলি তখন বিপ্লবীদের অন্যতম আস্তানা। দাদা ঘনশ্যামের মাধ্যমেই বৃন্দাবন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, ভূপতি মজুমদার, অতুল্য ঘোষের মতো প্রথিতযশা নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। এমনকি মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালি যাওয়ার পথে বজবজের একটি সভায় গুণধর তাঁকে সামনে থেকেও দেখেছিলেন।

সাদামাঠা জীবন ও স্বাধীনতার স্মৃতি

স্বাধীনতার পরে দীর্ঘদিন কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত থেকে ১৯৬৪ সালে মহিপালপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান এবং পরবর্তীতে প্রধানের দায়িত্ব সামলান গুণধরবাবু। গ্রামের উন্নয়নে তিনি তৈরি করেছিলেন ‘গান্ধী ঘর’। জীবনে কোনো দিন ফুলপ্যান্ট পরেননি, গায়ে আজও ওঠে শুধু সাদা খদ্দরের ধুতি আর পাঞ্জাবি। দেশ গড়ার কাজে অবদানের জন্য বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন ও শান্তিমোহন রায়ের কাছ থেকে পাওয়া ‘রক্তরাঙা’ মেডেল আজও তাঁর কাছে সযত্নে রক্ষিত।

আজ বয়স ৯৩ ছুঁইছুঁই। বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকেছে, চুলে পাক ধরেছে, চোখের চশমার পাওয়ারও অনেকটাই বেড়েছে। তবুও মনের জোর এক ফোঁটাও কমেনি। কাঁপা কাঁপা গলায় আজও তিনি স্পষ্ট মনে রেখেছেন সেইসব উত্তাল দিনের কথা। ছোট ছেলে মাধব বন্দ্যোপাধ্যায় ও এলাকার গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, গুণধরবাবুর মতো ব্যক্তিত্বরা আমাদের দেশের প্রকৃত ইতিহাস ও আদর্শের প্রতীক, যা আগামী প্রজন্মকে চিরকাল পথ দেখাবে।