১০০ ছুঁল মৃতের সংখ্যা! অসমের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় সর্বস্বান্ত লক্ষাধিক মানুষ, জলের নিচে ৪৫০-এর বেশি গ্রাম

অসমে ভয়াবহ প্লাবনের তাণ্ডব কিছুতেই থামছে না। প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্গত মানুষের চরম ভোগান্তি এবং দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বিগত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতিতে নতুন করে আরও দু’জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, যার ফলে চলতি বছরের এই ভয়াবহ বন্যায় মোট মৃতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ১০০-এর গণ্ডি স্পর্শ করেছে। প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যে প্রকাশ, সাম্প্রতিক প্রাণহানির এই মর্মান্তিক ঘটনা দুটি ঘটেছে গোলাঘাট ও কার্বি আংলং জেলায়, যেখানে আকস্মিক জলে ডুবে দুই অসহায় বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে। যদিও গত কয়েক দিনে রাজ্যের কিছু অংশে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, তবুও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।

বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চরইদেও, দারাং, গোলাঘাট, জোরহাট, কার্বি আংলং, নগাঁও এবং শিবসাগর—এই সাতটি প্রধান জেলা মিলিয়ে এই মুহূর্তে প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি সাধারণ মানুষ চরম জলযন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও শোচনীয় অবস্থা গোলাঘাট জেলার, যেখানে একাই প্রায় ৭০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণভাবে জলবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পাশাপাশি, মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে শিবসাগর (প্রায় ৪০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত) এবং জোরহাট (প্রায় ১৬ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত) জেলাগুলো। তবে গত শনিবার থেকে বৃষ্টির জোরালো ভাব কিছুটা কমায় কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় নদীর জল ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে, যা বিপর্যস্ত প্রশাসনকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত করতে পারেনি।

বন্যাদুর্গতদের দ্রুত উদ্ধার করতে এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাজ্যের মোট ছয়টি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় ১২৫টি বিশেষ ত্রাণশিবির ও সুসজ্জিত ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে অসম সরকার। বর্তমানে এই অস্থায়ী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪৯ হাজার ৬১ জন গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত মানুষ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় ওই শিবিরগুলোতে ৭১০.৪৪ কুইন্টাল চাল, ১২৭.৮৫ কুইন্টাল ডাল, ৩৮.৩৪ কুইন্টাল লবণ এবং ৩,৭৭৩.৭ লিটার সরষের তেল সফলভাবে বণ্টন করা হয়েছে।

এদিকে, সরকারি হিসাবের যে খতিয়ান সামনে এসেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। রাজ্যের মোট ৪৫৬টি গ্রাম বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে জলের তলায় তলিয়ে রয়েছে। জলের তোড়ে ও পলি জমে নষ্ট হয়ে গিয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৩৩.৪৬ হেক্টর জমির পরিপক্ব কৃষিজ ফসল, যা রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্লাবনের রুদ্ররোষে একাধিক জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ, গ্রামীণ সড়ক, সংযোগকারী সেতু এবং বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। নদনদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, গোলাঘাট ও নুমালিগড়ে ধানসিঁড়ি নদী এবং শ্রীভূমি অঞ্চলে কুশিয়ারা নদী এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে ফুঁসছে। কৃষিকাজের পাশাপাশি বোবা জীবজন্তুদের ওপরও নেমে এসেছে বড় বিপর্যয়। সাম্প্রতিক হিসেব বলছে, জলমগ্ন হয়ে ও বন্যায় ভেসে গিয়ে রাজ্যে অন্তত ৪৩ হাজার ৩৩১টি গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির প্রাণহানি ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্রাণের পাশাপাশি জলবাহিত রোগের প্রকোপ রোধ করা এবং লাখো মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।