১০০টির বেশি স্টেশন হবে ঝাঁ চকচকে! বাংলার রেল প্রকল্প নিয়ে বড় তথ্য দিলেন অশ্বিনী বৈষ্ণব

রাজ্যে রেল পরিকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লোকসভায় তৃণমূল সাংসদ মালা রায়ের একটি প্রশ্নের লিখিত জবাবে এই তথ্য স্পষ্ট করেছেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রেল প্রকল্পে যেখানে বছরে গড়ে ৪,৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হতো, সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে এই বরাদ্দ একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,২০৫ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ বিগত বছরগুলির তুলনায় বর্তমানে বরাদ্দ তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

রেলমন্ত্রী লোকসভায় আরও জানিয়েছেন যে, ২০২৬ সালের পয়লা এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে চলমান মোট ৬৩টি রেল প্রকল্প অনুমোদিত রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি নতুন লাইন নির্মাণ, ৪টি গেজ পরিবর্তন এবং ৪৫টি ডাবলিং বা দ্বৈত লাইন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সমস্ত প্রকল্পগুলির মোট দৈর্ঘ্য ৫,১৪৮ কিলোমিটার এবং এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩,৪৩৩ কোটি টাকা। সম্প্রতি রাজ্যজুড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ সফলভাবে সম্পন্নও হয়েছে। যার মধ্যে ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ রামপুরহাট-মন্দরহিল নতুন লাইন, ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আজিমগঞ্জ-মুর্শিদাবাদ নতুন লাইন, বর্ধমান-কাটোয়া এবং আহমেদপুর-কাটোয়া গেজ পরিবর্তন, এবং পাঁশকুড়া-খড়গপুর, লালগোলা-জিয়াগঞ্জ, কৃষ্ণনগর-বেথুয়াডহরি, নবদ্বীপধাম-পাটুলি সহ বিভিন্ন লাইনের ডাবলিং প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নিউ কোচবিহার-গুমানিহাট, নিউ কোচবিহার-সামুক্তলা রোড, আম্বারি ফালাকাটা-নিউ ময়নাগুড়ি এবং ব্যান্ডেল-বাঁইচি তৃতীয় লাইন প্রকল্পের কাজও সফলভাবে শেষ হয়েছে বলে রেলের তরফে জানানো হয়েছে।

প্রকল্পগুলি দ্রুত ও নির্বিঘ্নে বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। তবে রেলের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, বন দফতরের ছাড়পত্র, বিভিন্ন পরিকাঠামো স্থানান্তর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভৌগোলিক বা আবহাওয়াজনিত নানা বিষয় প্রায়শই প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, বহুচর্চিত চিংড়িহাটা ক্রসিংয়ে কলকাতা মেট্রোর ভায়াডাক্ট নির্মাণের জন্য ট্র্যাফিক ডাইভারশনের অনুমতি প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন রেলমন্ত্রী। তাঁর দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে আবেদন করা হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে ২০২৬ সালের মে মাসে এই অস্থায়ী ট্র্যাফিক ডাইভারশনের অনুমতি দেওয়া হয় এবং তারপরেই মে মাসের মধ্যে চিংড়িহাটা ক্রসিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়।

লেভেল ক্রসিংগুলির পরিবর্তে রোড ওভারব্রিজ (ROB) এবং রোড আন্ডারব্রিজ (RUB) নির্মাণের ক্ষেত্রেও বড়সড় তথ্য সামনে এনেছে রেল মন্ত্রক। ২০২৬ সালের পয়লা জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৪,৯৯৩টি ROB/RUB প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় ১.১৭ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে একাই পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে ৩৬৩টি প্রকল্প, যার আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৮,০৬০ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের মে মাস পর্যন্ত রাজ্যে মোট ৯টি ROB/RUB নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত তিন মাসে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে ১৫টি ROB এবং ২৪টি RUB অর্থাৎ মোট ৩৯টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে, যার জন্য আনুমানিক ১,৪৬০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে রেল জানিয়েছে যে, ২০২৬ সালের পয়লা এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন কারণে প্রায় ৯৯টি ROB/RUB প্রকল্প আটকে ছিল, যার মধ্যে অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত না হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা অন্যতম। তবে পরবর্তীতে যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ২৬টি প্রকল্পের জট সফলভাবে কেটে গিয়েছে।

যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গকেও অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের আওতায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশজুড়ে মোট ১,৩৪০০টি স্টেশনকে এই আধুনিকীকরণ প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে একাই পশ্চিমবঙ্গের ১০২টি স্টেশন রয়েছে। এই স্টেশনগুলিতে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা যেমন—আধুনিকীকরণ, প্রশস্ত যাত্রী প্রতীক্ষালয়, উন্নত শৌচাগার, আধুনিক প্ল্যাটফর্ম, ফুট ওভারব্রিজ, লিফট ও এসকেলেটর, সুপরিসর পার্কিং, রিয়েল-টাইম প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম, প্রতিবন্ধী-বান্ধব পরিকাঠামো এবং এয়ার কনকোর্স তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই আসানসোল, নিউ জলপাইগুড়ি, আলুয়াবাড়ি রোড, নিউ ফরাক্কা এবং বর্ধমান স্টেশনে উন্নয়নমূলক কাজের একটি বড় অংশ শেষ হয়েছে বা দ্রুতগতিতে চলছে। স্টেশন আধুনিকীকরণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে পূর্ব রেল, উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল, দক্ষিণ-পূর্ব রেল এবং মেট্রো রেল—এই চার জোন মিলিয়ে মোট ১,২৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৪৭১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে, রেল পরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাতে বাংলাজুড়ে এখন জোরকদমে কাজ চলছে।