হাসপাতালে জীবন বদল! ধনী পরিবারে জন্মেও দারিদ্র্যে কাটল দিন, ৬০ বছর পর আসল সত্যি জানার পর যা হলো?

জীবন যেন এক উপন্যাস! এমনই এক অবিশ্বাস্য অথচ মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হলো জাপান, যেখানে হাসপাতালের এক মারাত্মক ভুলের কারণে দুই নবজাতকের ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। ৬০ বছর ধরে ধনী পরিবারের সন্তান এক দরিদ্র ট্রাকচালক হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন, আর যাঁর হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম, তিনি বড় হয়েছেন রাজার হালে। ছয় দশক পর এই সত্য প্রকাশ্যে আসায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে দেশজুড়ে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ৬০ বছর বয়সি ওই ব্যক্তি এতদিন ট্রাক চালিয়ে দিন গুজরান করতেন। অথচ নিয়তির পরিহাসে তিনিই আসলে এক ধনী ব্যবসায়ীর সন্তান। তাঁরই প্রথম সন্তান হিসেবে রাজার হালে বড় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে টোকিওর সান-ইকুকাই হাসপাতালে জন্মলগ্নেই এক হতদরিদ্র বিধবা মহিলার নবজাতকের সঙ্গে অদলবদল হয়ে যান তিনি। ওই বিধবা মহিলা তখন স্বামীর মৃত্যুর পর বহু কষ্টে নিজের সন্তানদের সঙ্গে তাঁকেও বড় করেছেন।
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছিল তাঁর শৈশব। ছোট থেকেই তাঁকে রাতের স্কুলে পড়তে হয়েছে, কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি করতে হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে তিনি নাকি বিয়েও করতে পারেননি। তাঁর বিনোদন বলতে ছিল কেবল একটি রেডিও, যা তাঁর এক কামরার খুপরি ঘরের সঙ্গী ছিল।
সন্দেহের সূত্রপাত ও ডিএনএ পরীক্ষার চমক:
এই অবিশ্বাস্য সত্যের বীজ পোঁতা হয়েছিল সেই ধনী পরিবারের তিন ছোট ভাইয়ের মনে। তাঁরা বহু বছর ধরেই তাঁদের বড় দাদার চেহারার সঙ্গে পরিবারের আর কারও চেহারার কোনো মিল খুঁজে পেতেন না। এই বিষয়ে মাকে প্রশ্ন করলে, মাও একবার স্বীকার করেছিলেন যে, হাসপাতাল থেকে প্রথমবার ফেরার পর শিশুটির গায়ে অন্য পোশাক ছিল। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ভাইদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় এবং তাঁরা ডিএনএ পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সেই ডিএনএ পরীক্ষার ফল দেখেই স্তম্ভিত হয়ে যান সকলে। তাঁদের দীর্ঘদিনের সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হয় – যাকে এতদিন দাদা বলে জানতেন, তিনি আদৌ তাঁদের জৈবিকভাবে দাদা নন। এই আবিষ্কারের পর তাঁরা হাসপাতালের পুরনো রেকর্ড ঘেঁটে আসল দাদাকে, অর্থাৎ বর্তমানে ৬০ বছর বয়সী ওই ট্রাকচালককে খুঁজে বের করেন।
বিচার ও ক্ষতিপূরণ: জীবনের মূল্য কি ফিরিয়ে দেবে?
অবশেষে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি সান-ইকুকাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন। টোকিওর একটি জেলা আদালত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৩৮ মিলিয়ন ইয়েন (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২.২৭ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩২ মিলিয়ন ইয়েন পাবেন ওই ট্রাকচালক, এবং বাকি অর্থ পাবেন তাঁর তিন ভাই, যারা এই তদন্তের সূত্রপাত করেছিলেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ওই ট্রাকচালক তাঁর জীবনের নির্মম সত্য প্রকাশ করেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, “প্রথমে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। সত্যি বলতে, আমি এটা মেনেও নিতে চাইনি… আমার জীবনটা হয়তো অন্য রকম হতে পারত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি সময়টা ফিরিয়ে দিতে পারবে? আমার জন্মের দিনটা ফিরিয়ে দিতে পারবে?” তিনি জানান, সত্যিটা জানার পর বেশ কয়েক মাস ধরে তিনি রোজ কাঁদতেন। “আমার আসল বাবা-মায়ের ছবি দেখে মনে হত, ইস যদি ওঁদের জীবন্ত দেখতে পেতাম! ওঁদের ছবি দেখলেই চোখের জল ধরে রাখতে পারতাম না।”
তবে, যিনি তাঁকে বড় করেছেন, সেই পালিতা মায়ের প্রতি তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। বরং তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “বহু কষ্ট ভোগ করে আমাদের বড় করেছেন তিনি।” সত্যি জানার পরেও তিনি তাঁর দরিদ্র পালিত পরিবারটিকে ছেড়ে যাননি, বরং এখন তিনি তাঁদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন। জানা গেছে, ধনী পরিবারের চার ভাইও (যিনি তাঁদের জায়গায় বড় হয়েছেন, তিনি-সহ) নিজেদের হারিয়ে যাওয়া বড়দাদার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
শিশুদের অদলবদলের ঘটনা এই প্রথম নয়, তবে ছয় দশক ধরে এই নির্মম সত্য চাপা থাকাটা সত্যিই বিরল। সম্প্রতি রাশিয়ায়ও এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে ১০২ দিন পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মায়েরা তাঁদের আসল সন্তানকে ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু ৬০ বছর ধরে অন্যের জীবন যাপন করার এই গল্প মানব জীবনের নিয়তি ও ভাগ্যের এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল।