হরভজন সিংয়ের ভাইরাল ভিডিও ঘিরে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি! কোন বড় ভুলের জেরে প্রশ্নের মুখে পড়লেন স্বয়ং সাংসদ?

বিজেপি রাজ্যসভা সাংসদ হরভজন সিংয়ের সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরেই বর্তমানে পাঞ্জাবের রাজনৈতিক মহলে তীব্র শোরগোল ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে দুজন যুবককে রাস্তার পাশে অসংলগ্ন অবস্থায় টলতে দেখা যায় এবং দাবি করা হয় যে এটি পাঞ্জাবে বহুল আলোচিত কথিত ‘জম্বি ড্রাগ’-এর ভয়ংকর প্রভাবের ফল। তবে এই ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পরেই মাঠে নামে রাজ্য প্রশাসন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পাঞ্জাব পুলিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ভিডিওটিকে পাঞ্জাবের বলে চালানো হচ্ছিল, তার সঙ্গে পঞ্জাবের কোনো বাস্তব যোগসূত্র নেই। বরং এই ভাইরাল ভিডিওটি আসলে প্রতিবেশী রাজ্য রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগর এলাকার।

পুলিশের এই স্পষ্টীকরণের পরেই ওয়াকিবহাল মহলে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে যে, একজন দায়িত্বশীল সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও হরভজন সিং কেন কোনো রকম সত্যতা যাচাই বা অবস্থান নিশ্চিত না করেই এমন একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে শেয়ার করলেন। মূলত ওই ভিডিওটির মাধ্যমে পাঞ্জাবের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদক সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন ওই ক্রিকেট তারকা তথা রাজনীতিবিদ। তবে পাঞ্জাব পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে আসার পর থেকেই তাঁর এই পোস্টটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই ঘটনার জেরে আসরে নেমেছেন পাঞ্জাব সরকারের মন্ত্রী ডঃ বলজিৎ কৌর। তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন যে, রাজস্থানের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এলাকার ভিডিওকে পাঞ্জাবের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে পাঞ্জাব রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট করার গভীর চক্রান্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই রাজনৈতিক তরজায় যোগ দিয়েছেন আম আদমি পার্টির শীর্ষ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। তিনি বিজেপি শিবিরকে কঠোর ভাষায় নিশানা করে প্রশ্ন তুলেছেন যে, কেন বিজেপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য একই সময়ে সুনির্দিষ্টভাবে এই মিথ্যা দাবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলেন। তাঁর এই প্রশ্নটি মূলত সেই রাজনৈতিক কৌশলের দিকেই ইঙ্গিত করে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার একটিমাত্র যাচাই না করা পোস্টের মাধ্যমে খুব দ্রুত পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো যায়।

প্রকৃতপক্ষে, পাঞ্জাবের জন্য মাদকাসক্তি বরাবরই একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর সমস্যা। বিগত দিনে পাঞ্জাবের হাজার হাজার পরিবারকে এই ভয়ংকর সমস্যার চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে এবং এর ফলে যুব সমাজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যারা এই সংবেদনশীল বিষয়টিকে নিয়ে রাজনীতি করতে পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে যে তাঁরা অন্তত তথ্যগুলো ভালোভাবে যাচাই করে দেখবেন। কারণ রাজস্থানের কোনো বিচ্ছিন্ন ভিডিওকে পাঞ্জাবের ট্যাগ দিয়ে উপস্থাপন করলে পঞ্জাবের মাদক সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান হবে না, বরং এটি সস্তা জনপ্রিয়তার খাতিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মুহূর্তের শিরোনাম তৈরি করতে পারে মাত্র।

অন্যদিকে, পাঞ্জাব সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তারা রাজ্যের মাটি থেকে মাদকের অপব্যবহার নির্মূল করতে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। রাজ্য সরকারের প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭৩,৫৪১টি এনডিপিএস (NDPS) মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রায় ৯৮,৫৯৬ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ‘যুদ্ধ নশায়ন বিরোধী’ নামক এই বিশেষ অভিযানের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে ‘পিণ্ড দে পহরেদার’ ও বিশেষ মোবাইল অ্যাপের মতো একাধিক উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মাদকাসক্তির মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে, সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এবং বিরোধী দল হিসেবে জবাব চাওয়ার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার সবার রয়েছে। তবে এই ধরনের প্রশ্ন ও সমালোচনা সবসময় প্রকৃত পরিসংখ্যান, বাস্তব ঘটনা এবং পাঞ্জাবের সঠিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই হওয়া উচিত, অন্য কোনো রাজ্যের ভিডিও এনে পাঞ্জাবের ঘাড়ে দোষ চাপানো একেবারেই কাম্য নয়।