পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে রচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দুই দফার ভোটগ্রহণ শেষ হতেই যে তথ্য সামনে এসেছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। স্বাধীনতার পর থেকে এযাবৎকালের সমস্ত রেকর্ড চুরমার করে দিয়ে বাংলায় এবার ভোটদানের গড় হার দাঁড়িয়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। ২০১১ সালের সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের বছরকেও টেক্কা দিয়েছে ২০২৬-এর এই জনস্রোত। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো—এই উপচে পড়া ভোট আসলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি প্রত্যাবর্তনের সিলমোহর?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে যখন ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটেছিল, তখন রাজ্যে ভোট পড়েছিল ৮৪.৭২ শতাংশ। কিন্তু এবার সেই অঙ্ককে অনায়াসে ছাপিয়ে গিয়েছে ভোটারদের উপস্থিতি। দুই দফা মিলিয়ে রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৮২ লক্ষ ৫১ হাজার ৮ জন। শহর থেকে গ্রাম, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—সবত্রই বুথমুখী মানুষের লম্বা লাইন বুঝিয়ে দিয়েছে, বাংলার মানুষ এবার নিজেদের রায় জানাতে কতটা মরিয়া ছিলেন।
তবে এবারের ভোটের প্রেক্ষাপট অন্য বছরের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় এক বিশেষ সংশোধনী চালানো হয়েছিল, যার ফলে প্রায় ৯০ লক্ষ নাম (মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ) বাদ পড়েছিল। এই ইস্যু নিয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস বার বার সরব হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল তুলেছে। এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার পরেও ৯২ শতাংশের বেশি ভোটদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যদি নাম বাদ পড়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ থেকে থাকে, তবে তার আঁচ গিয়ে পড়তে পারে বিজেপির ওপর। অন্যদিকে, যদি ভোটাররা মনে করেন যে ‘ভুয়া ভোটার’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুক্ত স্বচ্ছ তালিকার কারণেই এই বিপুল ভোটদান সম্ভব হয়েছে, তবে তার সরাসরি সুবিধা পেতে পারে গেরুয়া শিবির।
আবার তৃণমূল শিবিরের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সুফল ভোগ করা মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বুথে এসেছেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বুথ ফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোল আসতে শুরু করেছে। ‘পিপলস পালস’-এর মতো সংস্থা তৃণমূলকে ১৭৭-১৮৭টি আসনে এগিয়ে রাখলেও, অন্যান্য অনেক সমীক্ষায় বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। বিপুল এই ভোট কার ভাগ্য বদলাবে—সোমনাথ শ্যামের তৃণমূল নাকি রাজেশ কুমারের বিজেপি? কার দাবি শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হবে, তার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে আগামী ৪ মে। আপাতত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা বাংলা।





