“সোলার দুর্নীতিতে হাতেনাতে ধরা! মালবাজারের প্রাক্তন তৃণমূল চেয়ারম্যান স্বপন সাহা সহ গ্রেফতার ৫”

আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং দুর্নীতির এক গুরুতর অভিযোগে মালবাজার পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল কংগ্রেস নেতা স্বপন সাহাকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তাঁর সঙ্গে আরও চারজন প্রভাবশালী পুর আধিকারিক ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতদের এই কড়া পদক্ষেপে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দীর্ঘ আইনি তদন্তের পর মঙ্গলবার সকালে প্রতারণার অকাট্য প্রমাণ হাতে আসতেই পুলিশ এই পাঁচজনকে হেফাজতে নেয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃতদের মধ্যে স্বপন সাহা ছাড়াও রয়েছেন মালবাজার পুরসভার প্রাক্তন স্টোর কিপার তথা মালবাজার টাউন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অমিত দে, ক্যাজুয়াল ইঞ্জিনিয়ার কুণাল সরকার, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সুমন চট্টোপাধ্যায় এবং পুরসভার ইলেকট্রিশিয়ান সুমিত দে। জলপাইগুড়ি জেলার পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপাণি জানিয়েছেন যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি (SIT) গঠন করে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালানো হয়েছিল। সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ হাতে আসতেই অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সেই সময় মালবাজার পুরসভার তরফে ১ কোটি ৫২ লক্ষ টাকার একটি সোলার লাইটের টেন্ডার ডাকা হয়। সেই টেন্ডারে অংশ নিয়ে কাজটি পেয়েছিল ধূপগুড়ির ‘মালাকার মেশিনারিজ’ নামক একটি বেসরকারি ফার্ম। অভিযোগ ওঠে যে ওই কাজের বরাত নিশ্চিত করার জন্য পুরসভাকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা উৎকোচ বা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পুরসভার পক্ষ থেকে ওই ফার্মকে একাধিক ভুয়ো রিসিভ বা রসিদ ধরানো হয় এবং ধাপে ধাপে আরও আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন কাজের অনুমতি মেলেনি, তখন ওই ফার্ম প্রশাসনিক মহলে যোগাযোগ করে। পরবর্তীতে রাজ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলানোর পর গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে মালাকার মেশিনারিজের তরফে বাসক মালাকার মালবাজার থানায় একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরেই নড়েচড়ে বসে জেলা পুলিশ প্রশাসন। মহকুমা পুলিশ আধিকারিক সুদীপ্ত সরকার এবং মালবাজার থানার আইসি সৌমজিৎ মল্লিকের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ এসআইটি দল তদন্তে নামে। তদন্ত চলাকালীন পুলিশ যখন টেন্ডার সংক্রান্ত নথি তলব করে, তখন পুরসভার পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয় যে এই ধরনের কোনো টেন্ডারই আদতে পাস করা হয়নি, অর্থাৎ গোটা প্রক্রিয়াটিই ছিল সম্পূর্ণ ভুয়ো ও বেআইনি। এরপরই মঙ্গলবার সকালে সমস্ত অভিযুক্তদের থানায় ডেকে পাঠানো হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই গ্রেপ্তারির ফলে শাসক শিবিরের অস্বস্তি চরম আকার ধারণ করেছে। পূর্বেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে স্বপন সাহাকে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল, যদিও পরবর্তীকালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁকে ফের দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনা প্রসঙ্গে বিজেপির মালবাজার মণ্ডল কমিটির সভাপতি নবীন সাহা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন যে তাঁরা বহুদিন ধরেই এই দুর্নীতির কথা বলে আসছেন, আর সরকার পরিবর্তনের ফলেই তা আজ প্রমাণিত হলো। অন্যদিকে, সিপিএমের মালবাজার এরিয়া কমিটির সম্পাদক রাজা দত্ত এই ঘটনাকে শহরের ইতিহাসের অন্যতম লজ্জাজনক অধ্যায় বলে অভিহিত করেছেন। যদিও ধৃতদের পক্ষের দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা ও সাজানো বলে দাবি করা হয়েছে।