নীল রঙের উর্দি পরা এই রহস্যময় জওয়ান কারা? দিল্লির NEET বিক্ষোভের মাঝেই দেশজুড়ে শুরু হলো চরম কৌতূহল!

দিল্লিতে NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকাণ্ড এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে বর্তমানে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এই ব্যাপক বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মাঝেই রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজপথে নজরে আসছে নীল উর্দি পরা এক বিশেষ ও বিশাল বাহিনী। সাধারণ কোনো পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে এদের কোনো মিল নেই। চোখে পড়ার মতো গাঢ় নীল রঙের ইউনিফর্ম পরিহিত এই জওয়ানরা আসলে ভারতের অত্যন্ত কড়া ও দক্ষ আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বা RAF-এর সদস্য। দেশের যেকোনো বড় মাপের রাজনৈতিক বিক্ষোভ, জনরোষ কিংবা দাঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কৌশল ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করাই এই বিশেষ বাহিনীটির মূল কাজ।
কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স বা CRPF-এর একটি অতি বিশেষ ও সংবেদনশীল উইং হলো এই RAF। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় এই বাহিনী এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ভারতের যেকোনো প্রান্তের বড় রাজনৈতিক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, হিংসাত্মক বিক্ষোভ, সংবেদনশীল ধর্মীয় শোভাযাত্রা কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের রায়ের পর সৃষ্ট অস্থিরতা মোকাবেলায় এদের দ্রুত তলব করা হয়। এমনকি দেশের যেকোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন—বন্যা, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য আপকালীন পরিস্থিতিতেও সাধারণ মানুষকে উদ্ধার করতে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এই জওয়ানরা।
দেশের কোথাও রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বা চরম অশান্তি বাঁধলে রাজ্য সরকারের বিশেষ অনুরোধ কিংবা সরাসরি কেন্দ্র সরকারের নির্দেশে বিদ্যুৎগতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় RAF। দেশের সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল তথা क्विक রেসপন্স ফোর্সের তালিকার একেবারে ওপরের সারিতে রয়েছে এই বাহিনী। অত্যন্ত কম বলপ্রয়োগ করে এবং ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে যেকোনো হিংসাত্মক জনতাকে ছত্রভঙ্গ বা নিয়ন্ত্রণ করাই এই স্পেশাল ফোর্সের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যখন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তখনই পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই চূড়ান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় RAF-কে।
সংঘাতময় ও বিস্ফোরক পরিস্থিতি সামাল দিতে RAF জওয়ানদের অত্যন্ত কঠোর ও বিশেষ বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ভিড়ের মনস্তত্ত্ব বা সাইকোলজি গভীরভাবে অনুধাবন করা, মানবাধিকার পুরোপুরি রক্ষা করে দাঙ্গা ও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা এবং সর্বপোরি যেকোনো চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও নিজেদের স্নায়ু ও ধৈর্য্য পুরোপুরি অটুট রাখা—এই সমস্ত বিষয়ে পারদর্শী করে তোলা হয় তাদের। বিশেষ করে নারী, শিশু ও অন্যান্য সংবেদনশীল গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করার বিশেষ পাঠও দেওয়া হয় জওয়ানদের।
সংঘাতের ময়দানে এই বাহিনী মূলত নন-লিথাল অস্ত্র বা প্রাণঘাতী নয় এমন সরঞ্জাম যেমন—টিয়ার গ্যাসের শেল, রাবারের বুলেট, শক্তিশালী বডি প্রোটেক্টর, দাঙ্গা-বিরোধী বিশেষ ঢাল এবং মজবুত হেলমেট ব্যবহার করে থাকে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা এদের মূল নীতি। যেকোনো প্রাণঘাতী বা মারাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার শুধুমাত্র চরম ও শেষ বিকল্প হিসেবেই বেছে নেয় এই বাহিনী।
শান্তি ও মৈত্রীর প্রতীক হিসেবেই RAF জওয়ানদের পরিচিতি। তাঁদের সুনির্দিষ্ট নীল রঙের ইউনিফর্ম এবং ‘সংবেদনশীল পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানবতার সেবা’—এই মূলমন্ত্রই তাদের সাধারণ পুলিশ থেকে আলাদা করে তোলে। দেশের রাজধানী দিল্লিতে যেহেতু সংসদ, রাষ্ট্রপতি ভবন, সুপ্রিম কোর্ট ও অসংখ্য বিদেশি দূতাবাস রয়েছে, তাই সামান্য অসাবধানতাও আন্তর্জাতিক স্তরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সেই কারণেই যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা বিপদের আঁচ পেলেই দিল্লিতে এই নীল উর্দির জওয়ানদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।