সোমবামের অনশনে মেদান্তায় ধুন্ধুমার! ২৬ দিন পর অবশেষে কীভাবে ঘুম ভাঙল কেন্দ্রের?

প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জোরালো দাবিতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র বিক্ষোভ ও উত্তাল আন্দোলন এখনও অব্যাহত রয়েছে। এই ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়ে বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক যন্তর মন্তরে এক অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছিলেন। দীর্ঘদিনের এই অনশনের ফলে কিছু না খাওয়ার কারণে তাঁর শরীরের ওজন দ্রুত কমতে শুরু করে এবং স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় প্রথমে তাঁকে দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। তবে ওয়াংচুকের জীবন বাঁচাতে এবং তাঁর অনশন ভাঙাতে মোদী সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব শুরু থেকেই অক্লান্ত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। বিক্ষোভের উত্তাপ প্রশমিত করতে এবং আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে সরাসরি কেন্দ্রীয় স্তরে একাধিক মন্ত্রীকে ময়দানে নামানো হয়। দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং সরকারের তরফ থেকে পাঠানো একের পর এক ইতিবাচক বার্তার ফলে অবশেষে ২৬তম দিনের মধ্যরাতে নিজের ঐতিহাসিক অনশন ভঙ্গ করেন সোনম ওয়াংচুক।
চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসা ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি নিয়ে দেশের শীর্ষ আদালতও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে প্রতিটি মানব জীবনই অত্যন্ত মূল্যবান এবং তার স্বাস্থ্যের ওপর নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি বজায় রাখা উচিত। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ও সংকট সমাধানের পথ প্রশস্ত করতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ডঃ জিতেন্দ্র সিং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেস বিবৃতিতে জানান যে, মোদী সরকার গত দুই দিনের মধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে আলোচনার জন্য চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সরকার শিক্ষার্থীদের সুবিধাজনক যেকোনো সময়ে এবং যেকোনো স্থানে খোলা মনে আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে। এমনকি তাদের দাবি ও শর্তগুলো নিয়ে কথা বলতেও সরকার কোনো রাখঢাক রাখছে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেও এই সংবেদনশীল বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের বারবার আহ্বান জানানো হয় যে কেবল খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই সমস্ত সমস্যার সঠিক সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অপর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডাও স্পষ্ট করে জানান যে শিক্ষার্থীদের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে এবং প্রয়োজনে তাদের বাড়িতে গিয়ে বা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বসেও আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে প্রশাসন।
অবস্থার গুরুত্ব বুঝে গতকাল সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকে জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সোনম ওয়াংচুকের দাবিগুলোকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে, তবে তার বর্তমান স্বাস্থ্য ও জীবনরক্ষা সরকারের কাছে সর্বাধিক অগ্রাধিকার পাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশমতো তৎক্ষণাৎ জিতেন্দ্র সিং ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলিকে সরাসরি ফোন করেন এবং তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে সমস্ত দাবি নিয়ে সরকার আন্তরিক। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কাউকে একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো সুযোগ নেই। এর আগে অনশনের ২৪তম দিনে (২১শে জুলাই) মেদান্তা হাসপাতালে গিয়ে ওই দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সরাসরি ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছিলেন। এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই পরীক্ষার স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করার বার্তা দিয়েছিলেন।
এই বহুমুখী পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। ওয়াংচুক ও বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নষ্ট হওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বিনীত জোশীকে তাঁর পদ থেকে অপসারিত করে পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রণালয়ে বদলি করেছে এবং তাঁর স্থлভাবে নরেশ গাঙ্গোয়ারকে নতুন সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দিল্লি হাইকোর্ট রাউজ অ্যাভিনিউ কোর্ট কমপ্লেক্সে একটি বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত স্থাপনের অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এই বিশেষ আদালতটি শুধুমাত্র ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস অ্যাক্ট’-এর অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলির ওপর শুনানি করবে। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধীদের সামলাতে এবং সরকারের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে জে.পি. নাড্ডা ও কিরেন রিজিজু সাফ জানিয়ে দেন যে সরকার যেকোনো মঞ্চে সুস্থ আলোচনা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত সিজেপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরকারের একাধিক ধাপের ফলপ্রসূ আলোচনার সূত্র ধরেই অবসান ঘটেছে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অনশনের।