খেলনা পিয়ানোয় বাম হাতের একতারা সুর! জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর কেমন আছে মাথায় গুলি লাগা আড়াই বছরের ছোট্ট মুসা?

রাজ্যজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া জাগানো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের ক্ষত আজও শুকোয়নি। দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই গণআন্দোলনের সহিংসতার ভয়াবহ স্মৃতি এবং যন্ত্রণা সযত্নে বয়ে বেড়াচ্ছে বহু শিশু ও কিশোর। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেই উত্তাল দিনগুলোতে চৌদ্দ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন এবং নিহতদের মধ্যে বহু শিশুও ছিল। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, সেই ভয়াবহ আন্দোলনে নিহত শিশুদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২৮ জন। কিন্তু যারা অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছে, তাদের দৈনন্দিন জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ঢাকার রামপুরার ছোট্ট বাসিত খান মুসা।

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই। রোজকার মতো বাবা মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে আইসক্রিম খাওয়ার বায়না ধরে ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে এসেছিল সাড়ে আট বছরের শিশু মুসা। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং নির্বিচারে গোলাগুলি শুরু হয়। বাড়ির গ্যারেজে বাবার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি আকস্মিক বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মুসার মাথার বাম অংশে। মুহূর্তের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অবুঝ শিশুটি। দিশেহারা বাবা তৎক্ষণাৎ ছেলেকে বুকে চেপে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে দৌড় দেন। কিন্তু তখনো তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, ঠিক তার পেছনেই আসছিল আরেকটি বুলেট, যা তাঁর প্রবীণা মা মায়া ইসলামের পেট ভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছিল।

হাসপাতালে পৌঁছে ছেলেকে আইসিইউতে ভর্তি করার পর যখন মায়ের নম্বরে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন মুস্তাফিজুর রহমান, তখন কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে বাড়ির কেয়ারটেকারের ফোন থেকে মর্মান্তিক সেই সংবাদ আসে যে, দাদী মায়া ইসলামও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এদিকে মুসার অবস্থা তখন চরম সংকটাপন্ন হওয়ায় মায়ের দাফনকার্য সম্পন্ন করতেও যেতে পারেননি অসহায় বাবা। একটানা নয় মাস হাসপাতালের আইসিইউ এবং বিভিন্ন উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে লড়তে হয়েছে মৃত্যুর সঙ্গে। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মুসার মাথায় মোট একুশটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। মাথার খুলির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বসানো হয়েছে কৃত্রিম খুলি এবং তরল খাবার ও অতিরিক্ত জল নিষ্কাশনের জন্য বিশেষ যন্ত্র।

বর্তমানে শিশুটির শরীরের ডান অংশ সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালাইজড। হাত-পা কাজ না করায় সে কেবল বাম হাতে খেলনা পিয়ানো বাজিয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতায় দিন কাটাচ্ছে। কথা বলতে না পারলেও সে সবকিছু স্পষ্ট বুঝতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালাতে গিয়ে এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তার পরিবার। সিঙ্গাপুরে ফলোআপ চিকিৎসার নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে গেলেও অর্থের অভাবে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি, মুসার বেঁচে থাকার জন্য যে বিশেষ তরল খাবার ও ওষুধ প্রয়োজন, তা কেবলমাত্র বিদেশেই পাওয়া যায়। সরকারের পালাবদলের পর নতুন করে আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতায় সহায়তার ফাইল আটকে থাকায় এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন সেই যুদ্ধজয়ী শিশুর অসহায় বাবা।