সূর্যালোকে জ্বলে ওঠে হোমের আগুন, এই মন্দিরে আজও দেবী আসেন গাংচিল রূপে! কোথায় রয়েছে এমন অলৌকিক পুজো?

পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরের বেরা বাড়ির দুর্গাপূজা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। ২৬০ বছরেরও বেশি পুরনো এই পুজোয় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি, বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক অদ্ভুত যোগসূত্র আজও অটুট। যেখানে এখন দেশলাই বা লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়, সেখানে এই বাড়ির হোমের আগুন জ্বলে আতস কাঁচের মাধ্যমে সূর্যের আলো ফেলে।
প্রযুক্তি-নির্ভর এই যুগে এমন একটি প্রথা দেখে চমকে ওঠেন অনেকেই। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এটি কেবল একটি প্রথা নয়, এটি প্রকৃতির শক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক। এই অনন্য প্রথা দেখতে প্রতি বছর বেরা বাড়িতে ভিড় জমান বহু মানুষ।
দেবী আসেন গাংচিল রূপে?
এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, একসময় দেবী নিজে গাংচিল রূপে এসে পুজো গ্রহণ করতেন। যদিও এখন আর সেই দৃশ্য দেখা যায় না, তবুও পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, দেবী এখনও জাগ্রত। মনস্কামনা পূরণের জন্য এখানে মানত করা হয়, অনেকে পুত্র কামনায় বড় বাতাসা উৎসর্গ করেন, আবার কেউ কেউ বোবা সন্তানের কথা ফোটার আশায় ওল মানত করেন।
জমিদারির ঐতিহ্যে আজও অবিবাহিত ব্রাহ্মণ!
এই পুজোর সূচনা করেছিলেন পরিবারের আদিপুরুষ জমিদার দর্পনারায়ণ বেরা। তিনি চিরকুমার ছিলেন। সেই প্রথা মেনে আজও দু’জন অবিবাহিত ব্রাহ্মণের কাঁধে ভর করে প্রতিমার কলা বউকে দিঘিতে স্নান করানো হয়। এখানে কোনও পশুবলি হয় না। নৈবেদ্যতে আজও এক কুইন্টাল চাল লাগে, যা এই পুজোর বিশালতার প্রমাণ দেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারির জৌলুস কমলেও, বেরা বাড়ির পুজো তার ঐতিহ্য হারায়নি। সামান্য দেবোত্তর সম্পত্তি ও স্থানীয়দের সহায়তায় এই প্রাচীন পুজো আজও টিকে আছে। দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের আগে তাকে পুরো দিঘি প্রদক্ষিণ করানো হয়, যা এই পুজোর একটি বিশেষ অংশ। বলা যায়, ভগবানপুরের বেরা বাড়ির দুর্গাপুজো প্রমাণ করে, আড়ম্বর কমলেও ঐতিহ্যের আলো কখনও ম্লান হয় না।