‘সব দোষ আমার, স্ত্রী-সন্তানদের কোনো ভুল নেই!’ মৃত্যুর আগে ডায়রিতে কী মর্মান্তিক বার্তা লিখে গেলেন পুলিশকর্মী?

রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক বা ডিজির দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় নিজের সার্ভিস রিভলভার দিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন এক হেড কনস্টেবল। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা পুলিশ মহলে ও প্রশাসনিক স্তরে তীব্র চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাইফাবাদ থানার পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, নিহত ওই পুলিশকর্মীর নাম ভিরুকোন্ডালু স্বামী (৪১)। তিনি মূলত তেলেঙ্গানার নলগোণ্ডা জেলার চিটওয়ালা মণ্ডলের ভেলিমিনেডু এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন এবং গত নয় বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এলিট ‘গ্রেহাউন্ডস’ (Greyhounds) বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমানে তিনি হায়দরাবাদের লাঙ্গার হাউস এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
ঘটনার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ করেই ডিজিপি কার্যালয়ের অভ্যন্তরে গুলির বিকট শব্দ শুনতে পেয়ে দপ্তরে কর্মরত অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত খোঁজাখুঁজি শুরু করার পর পুলিশ কর্মীরা শৌচালয়ের ভেতর তাঁকে রক্তাক্ত ও অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষকে পুরো বিষয়টি অবহিত করা হয়। পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে যে, গত ২ জুলাই থেকে তিনি ডিজিপি অফিসে ‘শো গার্ড’-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী মৌনিকা ছাড়াও হরি ও মণি নামের দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সম্প্রতি হায়াতনগর এলাকায় একটি নতুন বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন, যার জন্য তাঁকে ব্যাংক ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার বিশাল ঋণ নিতে হয়েছিল।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, বাড়ি তৈরির ঋণের পাশাপাশি অতিরিক্ত জুয়া খেলার নেশার কবলে পড়ে তাঁর কাঁধে আরও প্রায় ১০ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা চেপে বসেছিল। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঋণ শোধ করার জন্য তিনি নিজের পৈতৃক বা ব্যক্তিগত জমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাতে তীব্র বাধা দেন বলে অভিযোগ। এই আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে গত তিন মাস ধরে তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত অশান্তি ও বাদানুবাদ লেগেই ছিল। পুলিশি সূত্রে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, প্রায় এক বছর আগে তিনি তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উদ্দেশ্যে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি যে কোনো মুহূর্তে চরম ও মর্মান্তিক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে পেশাগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সুনামধন্য ছিলেন এবং একজন দক্ষ ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করেছে, যা এই মৃত্যুরহস্য উন্মোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে। ওই ডায়েরিতে স্ত্রীর উদ্দেশে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী ভাষায় লিখেছেন, “আমি তোমার সঙ্গেই বেঁচে থাকতে চাই, কিন্তু ঈশ্বর আমাকে আর বাঁচতে দিচ্ছেন না। এই সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। তোমরা পাশে না থাকলে এতদিন বেঁচে থাকতেই পারতাম না।” পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উদ্দেশে তিনি আরও লিখে গেছেন, “এখন যে জীবন কাটাচ্ছি, তা তোমাদেরই দেওয়া। কোনো এক সময় যদি আমাকে চিরতরে চলে যেতে হয়, তবে এই দিনগুলো তোমাদের জন্যই উৎসর্গ করা রইল। এই ঘটনার জন্য সমস্ত দোষ আমারই, আমার স্ত্রী বা সন্তানদের কোনো দোষ নেই।” গত বুধবার গভীর রাতে এই সুইসাইড নোট লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এই অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনায় সাইফাবাদ পুলিশ থানা থেকে স্বতঃপ্রণোদিত একটি মামলা রুজু করা হয়েছে এবং সমগ্র ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে।