শেয়ার বাজারে রক্তক্ষরণ! একদিনে হুড়মুড়িয়ে ৬০০ পয়েন্ট পড়ল সেনসেক্স, মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের

ভারতের শেয়ার বাজারে বুধবার দিনের শুরুতেই এক বিশাল এবং বিপর্যয়কর ধাক্কার মুখে পড়েছেন সাধারণ থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক একাধিক নেতিবাচক পরিস্থিতির জেরে এদিন শেয়ার বাজারে এমন এক ভয়াবহ পতনের চিত্র দেখা যায়, যা মুহূর্তের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ প্রস্তুতকারক অর্থাৎ ফার্মা খাত এবং ব্যাঙ্কিং সেক্টরে শেয়ার বিক্রির প্রচণ্ড চাপ, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত বা ক্রুড অয়েলের দামের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি এবং বাজারের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে শেয়ার ধরে রাখার বদলে তা বিক্রি করে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে পুরো বাজারে একটি প্রবল নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। এই শোচনীয় পরিস্থিতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রধান সূচকগুলির ওপরে। এর জেরে এদিন বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (BSE) প্রধান সূচক সেনসেক্স এক ধাক্কায় ৬০৩.৫১ পয়েন্ট বা ০..৭৮ শতাংশ অবনতি ঘটিয়ে সরাসরি ৭৬,৮৬৬.৬০ অঙ্কে এসে থিতু হয়। একই সময়ে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (NSE) প্রধান সূচক নিফটি ৫০ সূচকও ১৬০.৭৫ পয়েন্ট বা ০.৬৬ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২৪,০২৬.৯৫ অঙ্কের কাছাকাছি নেমে এসে লেনদেন চালাতে বাধ্য হয়।

পরিস্থিতি শুধু যে দেশের বৃহত্তম এবং প্রথম সারির বহুজাতিক সংস্থাগুলির শেয়ারের ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনক ছিল তা একেবারেই নয়, বরং মাঝারি এবং ছোট আকারের কোম্পানিগুলির শেয়ারেও এই বিক্রির তীব্র চাপ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। ব্রড মার্কেট বা সামগ্রিক বাজারের এই দুর্বলতার জেরে নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচক এক লাফে ১.১০ শতাংশ নিচে নেমে আসে। পাশাপাশি, নিফটি মিডক্যাপ ১০০ সূচক ০.৭০ শতাংশ এবং নিফটি মিডক্যাপ ৫০ সূচক ০.৭৪ শতাংশ পর্যন্ত বড় ধরনের পতনের শিকার হয়। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের এই সর্বগ্রাসী পতন বিনিয়োগকারীদের মনোবল সাময়িকভাবে অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে।

বাজারের এই ভয়াবহ রক্তপাতের পেছনে সবচেয়ে বড় এবং প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ প্রস্তুতকারী খাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সমস্ত জেনেরিক ওষুধের ওপর ধাপে ধাপে অত্যন্ত উচ্চ হারে শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করার এক আকস্মিক ও কঠোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। আর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় ওষুধ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির শেয়ারে হুড়মুড়িয়ে তীব্র বিক্রি শুরু হয়ে যায়। এর ফলে নিফটি ফার্মা সূচক এক ধাক্কায় ১.৭০ শতাংশ নিচে নেমে গিয়ে সেদিনের ব্যবসার সবথেকে খারাপ পারফর্ম করা সেক্টরে পরিণত হয়। গ্ল্যান্ড ফার্মা, পিপিএল ফার্মা, আলকেম ল্যাবরেটরিজ, লুপিন, অজন্তা ফার্মা এবং অরবিন্দো ফার্মার মতো প্রথম সারির একাধিক নামী সংস্থার শেয়ারে সরাসরি ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বড় পতন দেখা যায়। শুধু তাই নয়, গ্লেনমার্ক, বায়োকন এবং লরাস ল্যাবসের মতো সুপরিচিত সংস্থার শেয়ারের ওপরেও ব্যাপক বিনিয়োগের চাপ বজায় ছিল।

ওষুধ খাতের এই বিপর্যয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে মধ্য এশিয়ায় চরম উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের বা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক গণ্ডি অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়। যেহেতু ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ, তাই তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয়কে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে দেশে মূল্যস্ফীতি মাথাচাড়া দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন শিল্প সংস্থার উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে বিমান পরিবহণ পরিষেবা, রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনকারী সংস্থা, পেইন্ট এবং এফএমসিজি খাতের ওপর এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অত্যন্ত মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

ফার্মার পাশাপাশি দেশের শক্তিশালী আর্থিক স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ব্যাঙ্কিং এবং আর্থিক পরিষেবা খাতেও এদিন এক মারাত্মক ধাক্কা লাগে। নিফটি পিএসইউ ব্যাঙ্ক সূচক ১.৩৮ শতাংশ এবং নিফটি প্রাইভেট ব্যাঙ্ক সূচক ১.০৯ শতাংশ পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠান যেমন স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI), এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক এবং কোটাক মহিন্দ্রা ব্যাঙ্কের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য ও গভীর পতন পরিলক্ষিত হয়। এই সাধারণ মন্দার হাত থেকে রক্ষা পায়নি দেশের প্রযুক্তি বা আইটি খাতও। টেক মহিন্দ্রা, ইনফোসিস এবং টিসিএসের মতো মহারথী সংস্থার শেয়ারগুলি এদিন পুরো সময়জুড়েই লাল চিহ্নে অর্থাৎ লোকসানের মুখে লেনদেন করছিল। এর পাশাপাশি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আদানি পোর্টস, সান ফার্মা এবং ট্রেন্টের মতো দেশের বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলির শেয়ারের ওপরও প্রবল চাপ বজায় ছিল।

তবে এই সার্বিক ও অন্ধকারের মাঝেও একমাত্র অটোমোবাইল বা মোটর গাড়ি প্রস্তুতকারী খাত কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দিয়েছে। চলতি বছরের জুন ত্রৈমাসিকের অত্যন্ত ইতিবাচক এবং শক্তিশালী ব্যবসায়িক আপডেটের জোরালো সুবাদে নিফটি অটো সূচক সামান্য হলেও ঊর্ধ্বমুখী থাকতে সক্ষম হয়েছিল। অভিজ্ঞ বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ার বাজারের বর্তমান এই বড় ধরনের সংশোধন বা কারেকশন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত ভালো মানের এবং শক্তিশালী মৌলিক কাঠামোর শেয়ারগুলি তুলনামূলকভাবে অনেক কম দামে বা সস্তায় পোর্টফোলিওতে যুক্ত করার একটি দারুণ সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।