শুধু সন্তান না থাকলেই কি ডিভোর্স? পাটনা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে স্বস্তি পেলেন লক্ষ লক্ষ নারী!

বেশিরভাগ ভারতীয় পরিবারে বিয়ে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দম্পতিদের ওপর সন্তান নেওয়ার মারাত্মক চাপ তৈরি হয়। সন্তান না হলে প্রায়শই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও দূরত্ব তৈরি হয়, যা কখনও কখনও আইনি বিবাহবিচ্ছেদের দিকেও গড়ায়। এই পরিস্থিতিতে সমাজের প্রথাগত মানসিকতার কারণে নারীদেরই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এমনকি চিকিৎসকদের রিপোর্টে যদি স্বামীর শারীরিক সমস্যা প্রমাণিতও হয়, তবুও সহজেই সমস্ত দোষ নারীদের ঘাড়েই চাপানো হয়। এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে পাটনা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, শুধুমাত্র সন্তানের অনুপস্থিতি বা সন্তান না হওয়া কোনোভাবেই বিবাহবিচ্ছেদের আইনি ভিত্তি হতে পারে না।
আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে, স্ত্রী যদি তাঁর স্বামীর প্রতি কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা না করে থাকেন, তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা না করে থাকেন, কিংবা হিন্দু বিবাহ আইনে উল্লিখিত অন্য কোনো বৈধ বা আইনসম্মত কারণ না থাকে, তবে শুধুমাত্র সন্তান না হওয়ার ভিত্তিতে বিবাহবিচ্ছেদের আর্জি মঞ্জুর করা যাবে না। ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইনে বিবাহবিচ্ছেদের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ যেমন নিষ্ঠুরতা, ব্যভিচার, পরিত্যাগ, মানসিক অসুস্থতা বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রামক রোগের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও, কোথাও সন্তানহীনতার কারণে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো আইনি বিধান রাখা হয়নি। তবে স্বামী বা স্ত্রী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে বিবাহের সময় অপর পক্ষ তাঁর অক্ষমতা সম্পর্কে জানতেন এবং স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন অসম্ভব ছিল, তবে সেটি আইনি বিবেচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু কেবল সন্তান ধারণে অক্ষমতা নিজে থেকে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হতে পারে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর দায়িত্ব প্রায় সমান। এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে পুরুষ এবং সমসংখ্যক ক্ষেত্রে নারীরা দায়ী থাকেন। ফলে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শুধুমাত্র নারীদের দোষারোপ করা সম্পূর্ণ ভুল। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনে প্রকাশিত এনএফএইচএস-৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভারতীয় দম্পতি কোনো না কোনো পর্যায়ে বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভোগেন। অনেক নারী শুধুমাত্র সন্তান না থাকার কারণেই গার্হস্থ্য সহিংসতা, পারিবারিক চাপ এবং মানসিক হয়রানির শিকার হন। মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫-৩৪ বছর বয়সী সন্তানহীন বিবাহিত মহিলাদের মধ্যে ৪ শতাংশেরও বেশি এবং ৩৫-৩৯ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি নারী বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন বা আলাদা থাকছেন। এই পরিস্থিতিতে পাটনা হাইকোর্টের এই যুগান্তকারী রায় দেশের লক্ষ লক্ষ নারীর জন্য এক বিরাট আইনি স্বস্তি ও সুরক্ষার বার্তা নিয়ে এসেছে।