লাইসেন্স ফিতে বড় ছাড়! ভারতীয় রেলের নতুন নিয়মে কন্টেইনার ব্যবসায় বিপ্লব

ভারতীয় রেলওয়ে লজিস্টিক ও কন্টেইনার ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছে। কন্টেইনার ট্রেন অপারেটরদের জন্য প্রণীত ‘মডেল কনসেশন এগ্রিমেন্ট’ বা এমসিএ-তে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন অনুমোদন করেছে রেল মন্ত্রক। এর ফলে দেশের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা যেমন আরও সহজ ও একীভূত হলো, তেমনই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে উঠল। রেলের এই নতুন নীতির হাত ধরে আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক মাল পরিবহন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নতুন এবং সংস্কারকৃত নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে দেশের কন্টেইনার ট্রেন অপারেটররা একটি মাত্র ‘সিঙ্গল অল ইন্ডিয়া লাইসেন্স’-এর মাধ্যমেই সারা দেশের যেকোনো রুটে ট্রেন চালাতে পারবেন। অতীতে অপারেটরদের বিভিন্ন রুটের জন্য আলাদাভাবে লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হতো এবং রুটভিত্তিক ফি প্রদান করতে হতো, যা বর্তমান ব্যবস্থায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এই একক লাইসেন্স চালুর ফলে একদিকে যেমন দীর্ঘসূত্রিতা কমবে, অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতা থেকেও মুক্তি মিলবে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি নতুন আবেদনকারীকে এককালীন ২৫ কোটি টাকা নন-রিফান্ডেবল রেজিস্ট্রেশন ফি হিসেবে জমা দিতে হবে। এই নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমেই অপারেটররা ভারতীয় রেলওয়ের আওতাধীন সমস্ত রুটে নির্বিঘ্নে কন্টেইনার ট্রেন পরিচালনার অনুমতি পেয়ে যাবেন। পাশাপাশি, লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর অপারেটরদের কার্যক্ষমতা ও সন্তোষজনক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আরও কুড়ি বছরের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের লাইসেন্স নবীকরণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি ধার্য করা হবে না।

বিদ্যমান বা পুরোনো অপারেটরদের কথা মাথায় রেখে রেল মন্ত্রক বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে। বর্তমান ক্যাটাগরি-ওয়ান লাইসেন্সধারীরা তাঁদের বর্তমান লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত নিয়মেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন। পরবর্তীতে নতুন লাইসেন্সে রিনিউ বা এক্সটেনশনের সময় তাঁদের কোনো অতিরিক্ত ফি দিতে হবে না। অন্যদিকে, ক্যাটাগরি-টু, থ্রি এবং ফোর অপারেটরদের নতুন লাইসেন্সে রূপান্তরের জন্য ১৫ কোটি টাকা ফি দিতে হবে, যা মূলত নতুন ২৫ কোটি টাকার ফি এবং পূর্বের ১০ কোটি টাকা জমার পার্থক্য। অপারেটররা চাইলে তাঁদের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই ফি প্রদান করে নতুন লাইসেন্সে নিজেদের স্থানান্তরিত করতে পারবেন।

রেল মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকদের মতে, এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া যেমন সহজতর হবে, তেমনই কোম্পানিগুলির প্রশাসনিক খরচও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে। এর ফলে রেল খাতে বেসরকারি অংশীদারি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে এবং কন্টেইনার ট্রেন পরিষেবার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেলভিত্তিক মাল পরিবহন বৃদ্ধি পেলে দেশের সামগ্রিক লজিস্টিক খরচ অনেকটাই কমে আসবে, যার সুফল পাবেন বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই খাতের ব্যবসায়ীরা। সড়ক থেকে কন্টেইনার পরিবহন রেলে স্থানান্তরিত হলে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে, যা দেশের পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এক বিরাট ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে, এই সংশোধনের মাধ্যমে ভারতীয় রেল একটি স্বচ্ছ, সহজ এবং সম্পূর্ণ বিনিয়োগবান্ধব পরিকাঠামো তৈরি করল।