রথযাত্রা বিশেষ: বলরাম-সুভদ্রাকে নিয়ে মাসির বাড়ির পথে প্রভু জগন্নাথ, ভোরের মঙ্গলারতিতে সামিল অমিত শাহ

পুরীর আকাশজুড়ে ঘন মেঘের আনাগোনা আর ঝেঁপে বৃষ্টি—এ যেন স্বয়ং বরুণ দেবের আশীর্বাদ। প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে সৈকত শহর পুরীতে এখন লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম। শুক্লপক্ষের এই পুণ্য তিথিতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মাসির বাড়ি যাত্রার সাক্ষী হতে অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা দেশ। পবিত্র ‘পহন্ডি’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিগ্রহগুলিকে রথে আরোহণের পর শুরু হয়েছে রথযাত্রা। অন্যদিকে, আমদাবাদের জামালপুর এলাকায় ৪০০ বছরের পুরনো জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু হয়েছে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এই রথ উৎসব। ভোরবেলা মন্দিরে উপস্থিত হয়ে মঙ্গলারতিতে অংশ নিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
পুরীর মন্দিরে সুনিপুণ কারুকার্যে তৈরি হয়েছে তিনটি রথ—জগন্নাথদেবের ‘নন্দীঘোষ’, বলভদ্রের ‘তালধ্বজ’ এবং সুভদ্রার ‘দর্পদলন’ বা ‘পদ্মধ্বজ’। রথযাত্রার ধারাক্রম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রথযাত্রার শুরুতে থাকে বলরামের রথ, যিনি গুরুর প্রতীক। এরপর থাকে সুভদ্রার রথ, যিনি ভক্তির প্রতীক। সবশেষে আসে জগতের নাথ শ্রী জগন্নাথদেবের রথ, তিনি হলেন স্বয়ং ঈশ্বর। ধর্মীয় দর্শনে বলা হয়, গুরুর পথ ধরে ভক্তির মাধ্যমেই ঈশ্বরের চরণে আশ্রয় পাওয়া সম্ভব। রথযাত্রা হলো সেই আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীকী প্রকাশ।
সনাতন ধর্মের বারোটি প্রধান উৎসবের মধ্যে রথযাত্রা অন্যতম। আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে পালিত এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর দার্শনিক মাহাত্ম্য। স্কন্দপুরাণ অনুসারে, রথে উপবিষ্ট বিগ্রহের দর্শন লাভ করলে পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তি মেলে। রথযাত্রার দড়ি স্পর্শ করাও অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলে গণ্য করা হয়, যা ভক্তদের কাছে ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম। পুরীর রাজকীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, রথযাত্রার আগে গজপতি রাজা সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথ পরিষ্কার করেন, যাকে বলা হয় ‘ছেরা পাহরা’। অনেকে মনে করেন, এই রথযাত্রা হলো শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা থেকে বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তনের এক মহিমান্বিত রূপ।
পুরী ও আমদাবাদের রাজপথ এখন ভক্তির বন্যায় ভাসছে। আমদাবাদের জামালপুর এলাকায় সকাল থেকেই ভক্তদের দীর্ঘ লাইন। কঠোর নিরাপত্তা ও প্রশাসনের বিশেষ নজরদারিতে পালিত হচ্ছে এই উৎসব। বৃষ্টি উপেক্ষা করেও ভক্তদের আবেগ ও উদ্দীপনা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথে চড়ে মাসির বাড়ি যাত্রার এই দৃশ্য যেন ভক্তি ও ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন। রথের চাকায় টান পড়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা দেশ, আর সেই সঙ্গে চলছে অগণিত ভক্তের প্রার্থনা—জগন্নাথদেবের আশীর্বাদ যেন তাদের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।