যুদ্ধবিরতি নাকি কূটনৈতিক হার? ট্রাম্পের দাবির আড়ালে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির কঠোর বাস্তবতা

৪০ দিনের তীব্র সামরিক সংঘাত, ১১০ দিনের উত্তেজনা এবং ৭,০০০ মানুষের প্রাণহানির পর জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে স্বাক্ষর হলো বহু প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে নিজেদের ‘বড় জয়’ হিসেবে প্রচার করলেও, চুক্তির শর্তাবলী এবং পর্দার পেছনের সমীকরণ বলছে অন্য কথা। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি ট্রাম্পের আলোচিত ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) নীতির এক চরম ব্যর্থতার দলিল।
চুক্তির অন্তরালে ট্রাম্পের ‘আত্মসমর্পণ’? জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ পেজেশকিয়ান ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। ট্রাম্প নিজেকে ‘বস’ হিসেবে দাবি করলেও, চুক্তির শর্তগুলো দেখলে বোঝা যায়, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য স্থির করেছিলেন, তার প্রায় কিছুই অর্জিত হয়নি।
শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন: ট্রাম্প ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হুমকি দিলেও, চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: ট্রাম্প ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু চুক্তির ফলে ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার পাশাপাশি তেল রপ্তানিতে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। জব্দকৃত সম্পদও ফেরত পাচ্ছে তেহরান।
সামরিক অবস্থান: চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইরানের ওপর কঠোর কোনো বিধিনিষেধ নেই। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বাইরে।
কেন এই চুক্তি? চাপের মুখে ট্রাম্প যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা এবং তেলের সংকট তৈরির আশঙ্কা ছিল। পরিসংখ্যান বলছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছিল। এছাড়া ৩৯টি বিমান ও ড্রোনসহ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম খোয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এবং শেয়ার বাজারে ধসের মুখে ট্রাম্প দ্রুত এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিলেন।
কী বলছে ইরান? ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার কালিবাফ সাফ জানিয়েছেন, “আমরা আমেরিকা ও ইসরায়েল উভয়কেই পরাজিত করেছি। শত্রুকে আপস করতে বাধ্য করা হয়েছে।” ইরানের দাবি, তাদের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তিতে নামতে বাধ্য করেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প এই চুক্তিকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও, এর পেছনে অর্থনৈতিক উদ্বেগের বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ইরান কখনো যুদ্ধে না জিতলেও আলোচনার টেবিলে সবসময় শক্তিশালী থাকে—এই পুরোনো কথাটিই যেন পুনরায় প্রমাণিত হলো।