‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ৮৪৩, আর জাতিসংঘ বলছে ১৪০০!’ জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না কেন?

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও শহীদ ও নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ও ধোঁয়াশার কোনো অবসান ঘটেনি। বরং দিন যত গড়াচ্ছে, এই সংবেদনশীল ইস্যুটি ঘিরে প্রশ্ন, সংশয় এবং রাজনৈতিক তরজা কেবলই তীব্রতর হচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক মহল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই অমীমাংসিত সংখ্যাটিকে নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নানা রকম প্রোপাগান্ডা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিহতদের সংখ্যা নিয়ে এই চলমান বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের মধ্যে থাকা এক বিশাল ও অগ্রহণযোগ্য ফারাক। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) থেকে একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সে সময় অনেকেরই ধারণা ছিল যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাবের মধ্যকার ব্যবধান ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। কিন্তু সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ‘জুলাই শহীদদের’ যে সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৪৩ জনে। অথচ জাতিসংঘের রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে চলা বিক্ষোভ ও সংঘাতের জেরে বাংলাদেশে প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ, দুই প্রামাণ্য পরিসংখ্যাণের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যার এই বিশাল ফারাক এখনও ৫০০ জনেরও ওপরে রয়েছে, যা নিয়ে সর্বমহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, পরিসংখ্যানে এই ব্যাপক ফারাকের ফলে যে অনভিপ্রেত বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক স্বৈরশাসক ও তাদের দোসরদের সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে। তাদের কর্মী-সমর্থকরা এই ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বহুমুখী প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের প্রবীণ লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকেই এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের অভাব ছিল, যার ফলেই বিতর্ক এতদূর গড়িয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন যে, এখনই প্রতিটি গ্রামে ও প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করে নির্ভুল তথ্য সামনে না আনলে একাত্তরের শহিদদের সংখ্যার মতো জুলাইয়ের ইতিহাসও চিরকাল অমীমাংসিত বিতর্কের আবর্তে বন্দি হয়ে থাকবে।

তবে বর্তমান বিএনপি সরকার এই জটিলতা কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে অত্যন্ত তৎপর বলে জানিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন যে, সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই বিষয়টি দেখছে এবং নিহতের একটি নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রক্রিয়াটিকে আরও নিখুঁত ও গতিশীল করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি আলাদা অধিদপ্তর পর্যন্ত গঠন করে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশবাসীর পাশাপাশি স্বজনহারা মানুষ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো একটি নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল। আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ সংবিধিবদ্ধ সংস্থাসহ জাতিসংঘের সহায়তা চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে জাতিসংঘের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে প্রায় পাঁচ মাস ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালায়। গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত সেই রিপোর্টে বলা হয় যে, নিহতদের বিশাল একটি অংশের মৃত্যু নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র ও শটগানের গুলিতেই হয়েছে। কেবল তাই নয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছিল বলেও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের নতুন এই উদ্যোগের ফলে প্রকৃত সত্য সামনে আসে কি না।