দাবি পূরণ না হলে খাবার নয়! আমরণ অনশনে অনড় ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতো, নড়েচড়ে বসল প্রশাসন!

ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC) এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশন (JSSC CGL)-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়সি বিশিষ্ট ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো। গত ৩ জুলাই থেকে টানা অনশনে বসে থাকার ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে শুরু করেছিল। অবশেষে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ তথা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের আন্তরিক অনুরোধে সাড়া দিয়ে বুধবার সামান্য জল গ্রহণ করেছেন এই লড়াকু আন্দোলনকারী। তবে জল খেলেও তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে যতদিন না পরীক্ষার্থীদের সমস্ত দাবিদাওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে, ততদিন তিনি খাবার স্পর্শ করবেন না এবং তাঁদের এই ঐতিহাসিক আন্দোলন অবিরাম গতিতে চলতে থাকবে।
ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রায় ১০ মিনিট ধরে দেবেন্দ্রর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন সোনম ওয়াংচুক। আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর পূর্ণ নৈতিক সমর্থন ব্যক্ত করার পাশাপাশি ছাত্রনেতার দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই পরিবেশকর্মী। একটানা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে সাহস জুগিয়ে সোনম অনুরোধ করেন, অন্তত যেন তিনি প্রাণরক্ষার্থে জলটুকু গ্রহণ করেন। পরিবেশকর্মীর সেই আবেদনে সাড়া দিয়েই জল পান করেন দেবেন্দ্র। পরে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, “আমার শরীর বেশ কয়েক দিন ধরেই ভালো যাচ্ছিল না। তবে সোনম ওয়াংচুকজির অনুরোধেই আমি জল ছুঁয়েছি। দিল্লির যন্তর মন্তরে তিনি যেভাবে আমাদের জোরালো সমর্থন জানিয়েছিলেন, আমরা এখানেও তাঁর উপস্থিতি ও সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করছি।”
তবে জল খাওয়ার পরো লড়াই যে একচুলও থামছে না, তা শুরুতেই অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই ছাত্রনেতা। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, “সরকার যতক্ষণ না আমাদের প্রতিটি দাবিদাওয়া মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ আমি এক গ্রাসও খাবার খাব না। কেবল অনশন ভাঙার কথা বলে লাভ নেই, আমি শুধু জলটুকু মুখে তুলেছি।” এর পাশাপাশি তিনি সোনম ওয়াংচুককে সশরীরে রাঁচিতে আসার বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনি নিজে এসে আমাদের আন্দোলন মঞ্চে দেখা করলে তবেই আমরা অনশন প্রত্যাহারের কথা ভাবব। আমরা আপনাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি, দয়া করে একবার আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান।”
আগামী বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হতে চলেছে ঝাড়খণ্ড বিধানসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাদল অধিবেশন। তার ঠিক প্রাক্কালে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো একা নন, তাঁর সঙ্গে রাঁচির রাজপথে আরও পাঁচজন বেকার চাকরিপ্রার্থী অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশনে বসেছেন। গত ১০ দিন ধরে চাকরিপ্রার্থীদের দুটি পৃথক গোষ্ঠী রাস্তায় নেমে লাগাতার বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছে। তাঁদের মূলত তিনটি প্রধান দাবি রয়েছে— প্রথমত, ১৪তম জেপিএসসি (JPSC) পরীক্ষা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে; দ্বিতীয়ত, জেপিএসসি এবং জেএসএসসি (JSSC) পরিচালন ব্যবস্থায় আমূল ও বড়সড় সংস্কার আনতে হবে; এবং তৃতীয়ত, পরীক্ষা সংক্রান্ত এই ব্যাপক দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হয় সিবিআই (CBI) অথবা রাজ্যের বাইরের কোনো হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন নিরপেক্ষ প্যানেলকে দিয়ে করাতে হবে।
‘জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চ’-এর মুখপাত্র জীবন কুমার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই আন্দোলনকে আরও বেশি গণমুখী ও জোরদার করতে আরও পাঁচজন সদস্য, যার মধ্যে দুজন লড়াকু মহিলাও রয়েছেন, মঙ্গলবার রাত থেকে অনশন কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। সরকারের ওপর সঠিক চাপ বজায় রাখতে শীঘ্রই একটি উচ্চপর্যায়ী কোর কমিটির বৈঠক ডেকে বিশাল আকারের ‘তেরঙ্গা যাত্রা’ বা ‘তিরঙ্গা মার্চ’-এর আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি। অনশনকারী সিতা কুমারী আক্ষেপের সুরে বলেন, “সরকার আমাদের নায্য দাবিগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে, তাই বাধ্য হয়ে আমাদের এই চরম ও পথ বেছে নিতে হয়েছে।”
পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখে এবং রাজ্যজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভের বহর তীব্র আকার ধারণ করায় অবশেষে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। মঙ্গলবার তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, আন্দোলনকারী চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ ও দাবিদাওয়াকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সুনির্দিষ্ট পর্যালোচনার পর সঠিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে। আমি পূর্ণ বিশ্বাস রাখি যে, রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপে আন্দোলনকারীরা সম্পূর্ণরূপে আশ্বস্ত হবেন।”
অন্যদিকে, পরীক্ষায় কারচুপি ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্তে নেমে ঝাড়খণ্ড পুলিশের সিআইডি শাখা ইতিমধ্যেই ১৪ জন প্রভাবশালী অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। ছাত্র বিক্ষোভের এই উত্তাল পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে তড়িঘড়ি আগামী ২৫ থেকে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হতে চলা ‘কমবাইন্ড সিভিল সার্ভিসেস মেইনস’ পরীক্ষা স্থগিত করার কথা ঘোষণা করেছে জেপিএসসি কর্তৃপক্ষ। যদিও পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রশাসনের তরফে কেবল “অনিবার্য কারণ”-কেই দায়ী করা হয়েছে, তবে এর নেপথ্য যে ছাত্ররোষ, তা বলাই বাহুল্য।