মহিষামারিতে জলস্তম্ভের তাণ্ডব! হুগলি নদীতে জোড়া টর্নেডো ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য

দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর দ্বীপে বৃহস্পতিবার এক অবিশ্বাস্য এবং বিরল প্রাকৃতিক ঘটনার সাক্ষী থাকলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ সাগর দ্বীপের মহিষামারি এলাকায় হুগলি নদীর উপর হঠাৎ করেই একসঙ্গে দুটি টর্নেডোর মতো বিশাল জলস্তম্ভ বা ‘ওয়াটারস্পাউট’ তৈরি হতে দেখা যায়। নদীর বুক থেকে ঘূর্ণায়মান জলরাশিকে তীব্র গতিতে আকাশের দিকে উঠে যেতে দেখে গোটা এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়। এই অস্বাভাবিক এবং ভয়ঙ্কর দৃশ্য ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা, মৎস্যজীবী এবং নদীপথে চলাচলকারী নৌকাচালকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা সজল মণ্ডল প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জানান, “প্রথমে নদীর মাঝখানে জল ঘুরপাক খেতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে সেই ঘূর্ণন তীব্র আকার ধারণ করে আকাশমুখী জলস্তম্ভের রূপ নেয়। আশ্চর্যের বিষয়, একটির খুব কাছেই আরও একটি একই রকম ঘূর্ণায়মান জলস্তম্ভ তৈরি হয়। জোড়া টর্নেডোর মতো এই বিরল দৃশ্য দেখে অনেকেই যেমন মোবাইলে ভিডিয়ো রেকর্ড করতে শুরু করেন, আবার অনেকে ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে নিরাপদ স্থানে ছুটতে থাকেন।”

স্থানীয় মৎস্যজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন দৃশ্য তাঁদের অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত বিরল। প্রবীণ মৎস্যজীবী নিমাই দাস বলেন, “নদীর জল আচমকা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠতে থাকে এবং বাতাসের গতি তীব্র হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে নদীতে থাকা ছোট নৌকা ও মাছ ধরার ট্রলারগুলিকে দ্রুত ঘাটের দিকে ফিরিয়ে আনা হয়। অনেক ট্রলার মাঝনদী থেকেই প্রাণ বাঁচাতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।”

এই জোড়া টর্নেডোর দৃশ্য স্থায়ী হয়েছিল কয়েক মিনিট মাত্র। কিন্তু তার পরপরই আবহাওয়ার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং শুরু হয় প্রবল দমকা হাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাগর দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে জনজীবনে সাময়িক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে নদী সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী মানুষজন নিজেদের সুরক্ষার জন্য সতর্ক হয়ে পড়েন।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক ড. সুজিত মণ্ডল ব্যাখ্যা করে জানান, “গ্রীষ্মের শেষে বা বর্ষার প্রাক্কালে সমুদ্র ও নদী সংলগ্ন অঞ্চলে জলীয় বাষ্প, তাপমাত্রার তীব্র পার্থক্য এবং বায়ুচাপের আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে কখনও কখনও এই ধরনের জলস্তম্ভ বা ‘ওয়াটারস্পাউট’ তৈরি হতে পারে। সাধারণ মানুষ এটিকে টর্নেডো হিসেবেই দেখেন। যদিও এমন ঘটনা উপকূলবর্তী অঞ্চলে বিরল, তবে আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি মাঝে মাঝে দেখা যেতে পারে।”

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয়দের এবং নদীপথে যাতায়াতকারী নৌকা ও মৎস্যজীবীদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিনভর সাগরের বুকে এই বিরল প্রাকৃতিক দৃশ্য নিয়ে স্থানীয় মহলে ব্যাপক চর্চা অব্যাহত ছিল। দুর্যোগ না ঘটলেও, এই ঘটনা যে প্রকৃতির এক অদ্ভুত রূপ, তা মেনে নিচ্ছেন সবাই।