মদন মিত্রের কপালে চরম বিপদের মেঘ! পুরনিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে এবার সিজিও কমপ্লেক্সে তলব প্রভাবশালী তৃণমূল বিধায়ককে

রাজ্যজুড়ে বহুল আলোচিত পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে এবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র সরাসরি কড়া নজরে পড়েছেন শাসকদলের প্রভাবশালী নেতা তথা কামারহাটির হেভিওয়েট তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র। তদন্তকারী সংস্থার কঠোর নির্দেশিকা অনুযায়ী, আজ বুধবার সকালেই কলকাতার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত ইডি দপ্তরে তাঁর সশরীরে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল জিজ্ঞাসাবাদ পর্বে তদন্তে পূর্ণ সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের হিসেব ও অন্যান্য জরুরি কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য তাঁকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইডি সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে প্রকাশ, রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভায় সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম এবং বেআইনি চাকরি বিক্রি সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি তদন্ত প্রক্রিয়ায় একাধিক চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসে পৌঁছেছে। সেই সমস্ত সূত্র ধরেই তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রকে ডেকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের এই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ইডি আধিকারিকদের জোরালো দাবি, এই জটিল মামলার সঙ্গে যুক্ত গোপন আর্থিক লেনদেন, অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।

উল্লেখ্য, এর আগেই পুরনিয়োগ দুর্নীতির এই জটিল মামলায় মদন মিত্রের সহধর্মিণী এবং তাঁর দুই পুত্রকেও দীর্ঘ সময় ধরে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন ইডি আধিকারিকরা। সেই সময় তদন্তের স্বার্থে তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন গোপনীয় নথি ও বিপুল আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত পাকাপোক্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল বলেও ইডি সূত্রের জোরালো দাবি। কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের প্রাথমিক অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পুরসভাগুলির বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অন্তত ১২৫ জন প্রার্থীকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে যে, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিরীহ চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কুখ্যাত উপায়ে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছিল। সেই বেআইনি ঘুষের কালো টাকা কোন কোন গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছিল, কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি সেই বিপুল অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী ছিলেন এবং সেই কালো টাকার আসল গতিপথ বা ট্রেইল কী ছিল—তা নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখাই বর্তমানে ইডি তদন্তকারীদের মূল ও একমাত্র লক্ষ্য। কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই বিপুল অঙ্কের দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থ অত্যন্ত সুকৌশলে একাধিক বেনামী ব্যক্তি ও জটিল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়েছে। সেই কারণেই সমস্ত আর্থিক লেনদেনের আইনি নথি, একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিশদ বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রমাণাদি এখন অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইডি সূত্রে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে যে, যেসব পুরসভায় বেআইনিভাবে চাকরি বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তার মধ্যে কামারহাটি পৌরসভা অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই নির্দিষ্ট পুরসভায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘন করে একাধিক চরম অনিয়ম করা হয়েছিল এবং সেই অবৈধ নিয়োগ কাণ্ডকে কেন্দ্র করেই কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন প্রকাশ্যে এসেছে। বর্তমানে তদন্তকারীরা সেই বিতর্কিত নিয়োগের সমস্ত নথি, প্রশাসনিক অনুমোদনের গোপন প্রক্রিয়া এবং কালো টাকার মূল উৎস ও গন্তব্য একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

আজকের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদ পর্বে মদন মিত্রের ব্যক্তিগত বক্তব্য, তাঁর কাছে সংরক্ষিত থাকা বিভিন্ন নথিপত্র এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য মামলার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে করছে ইডি। সেই সুনির্দিষ্ট কারণেই তাঁকে সমস্ত প্রাসঙ্গিক আইনি নথি সঙ্গে নিয়ে নির্ধারিত সময়ে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল জিজ্ঞাসাবাদের সন্তোষজনক অগ্রগতি এবং প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতার ওপর নির্ভর করেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তাদের পরবর্তী কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty