পিওকে-র রক্তে ভেজা রাজপথ! আন্দোলনকারীদের সরাসরি ‘ভারতের মতো শত্রু’ বলে দেগে দিলেন খাজা আসিফ

পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) চলা তীব্র ও রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভের আবহে অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং বিস্ফোরক মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। পাকিস্তানের বেআইনি ও বলপূর্বক দখলকৃত এই অঞ্চলে সাধারণ মানুষ যখন লাগাতার মুদ্রাস্ফীতি, প্রশাসনিক বঞ্চনা ও মৌলিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আন্দোলন করছেন, তখন তাঁদের সরাসরি ‘ভারতের মতো শত্রু’ বলে দেগে দিয়েছেন খাজা আসিফ। শুধু তাই নয়, প্রতিবাদী সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচারে গুলি চালানোর পৈশাচিক ঘটনাকে প্রকাশ্যেই সমর্থন জানানোর পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছেন এই পাক মন্ত্রী।
একটি স্থানীয় প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, “যারা সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি রাস্তায় নেমেছে, আমি তাদের ভারতের সঙ্গেই এক ক্যাটাগরিতে রাখছি এবং ভারতের মতোই তাদের শত্রু বলে গণ্য করছি।” তাঁর এই চরম মন্তব্য ইসলামাবাদ প্রশাসনের প্রকৃত ও নিষ্ঠুর মানসিকতাই উন্মোচিত করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নিষিদ্ধ ঘোষিত জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-এর ডাকে পিওকে-র বুকে চলা এই জনআন্দোলন দমন করতে সম্প্রতি অকল্পনীয় নৃশংসতা চালায় পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী। রাওয়ালকোট থেকে মুজাফ্ফরাবাদ অভিমুখে সাধারণ মানুষের একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিল এগোচ্ছিল, সেই মিছিলেই পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কোনো রকম রাখঢাক না করে নির্বিচারে গুলি চালায় বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পিওকে-র ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অন্যতম ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী এই দমনপীড়নে ঘটনাস্থলেই অন্তত ১৪ জন নিরীহ আন্দোলনকারী প্রাণ হারান।
জেএএসি (JAAC)-র পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, প্রায় ৫ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে এই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। অথচ পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মীরা সম্পূর্ণ বিনা প্ররোচনায় তাঁদের ওপর মারণাস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। এই বর্বরোচিত সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৪ জন নিহত এবং দু’ডজনেরও বেশি মানুষ গুরুতর জখম হন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে জেএএসি-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য উমর নাজিরের ছোট ভাই উসমান নাজিরও রয়েছেন, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুন আরও বেশি দাউদ করে জ্বলে উঠেছে।
অন্যদিকে, পাক সরকারের প্রশাসনিক সূত্রের দাবি সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীরা নাকি আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ছিল এবং তারা প্রথমে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালায়, যার জেরে বাধ্য হয়েই পুলিশকে আত্মরক্ষার্থে কঠোর পদক্ষেপ করতে হয়েছে। যদিও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি দাবির সত্যতা কোনোভাবেই যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া এই গণআন্দোলন ও লাগাতার সামরিক দমনপীড়নে এখন পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর পাওয়া গেছে। এর আগেকার সংঘর্ষ ও বিক্ষোভে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৩৪ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং ৬ জন নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন। আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র লোডশেডিং এবং দশকের পর দশক ধরে চলা প্রশাসনিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ এখন এক বিশাল ও অদম্য জনরোষে রূপ নিয়েছে।
এদিকে, যখন পিওকে জুড়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও চরম বিশৃঙ্খলা চলছে, ঠিক সেই সুসময়েই সেখানে তথাকথিত বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করেছে পাকিস্তান সরকার। ব্যাপক সেনা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী সত্ত্বেও একাধিক নির্বাচনী এলাকায় ভয়াবহ সংঘর্ষ, ব্যালট বাক্স লুট এবং দিনের আলোয় ভোট কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। পাকিস্তানের এই প্রহসনের নির্বাচনকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় তীব্র সমালোচনা করেছে নয়াদিল্লি। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) সরকারি মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই ধরনের লোক দেখানো নির্বাচনী কসরত করে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলের নজর ঘোরাতে পারবে না এবং তাদের অবৈধ দখলদারি ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কোনোভাবেই ধামাচাপা দিতে পারবে না।
ভারতের সুষ্পষ্ট ও অটল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন যে, জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখের সম্পূর্ণ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যার মধ্যে পাকিস্তানের অবৈধ ও বলপূর্বক দখলে থাকা অংশগুলিও সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত, তা ভারতের অবিচ্ছেদ্য এবং অভিন্ন অঙ্গ। পাশাপাশি, পিওকে-র এই তীব্র গণবিক্ষোভ পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ, মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং অমানবিক প্রশাসনিক নিপীড়নেরই এক অবধারিত পরিণতি বলে মন্তব্য করেছে নয়াদিল্লি।