মাথার দাম ১ কোটি! প্রায় দু’ দশক পর ঝাড়খণ্ডে পুলিশের জালে ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী শীর্ষ কমান্ডার মিসির বেসরা

মাওবাদীবিরোধী অভিযানে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মুকুটে যুক্ত হলো এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে লাগাতার তল্লাশি অভিযান সত্ত্বেও যিনি পুলিশের নাগালের বাইরে ছিলেন, অবশেষে সেই মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী শীর্ষ কমান্ডার তথা নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওবাদী)-র পলিটব্যুরোর সর্বশেষ সক্রিয় সদস্য মিসির বেসরাকে ঝাড়খণ্ড থেকে গ্রেফতার করেছে যৌথ বাহিনী। শুধু মিসির বেসরাই নন, তাঁর সঙ্গে থাকা চার অন্যান্য সহযোগীকেও পাকড়াও করা হয়েছে। ধৃত এই শীর্ষ নেতার মাথার দাম ধার্য করা হয়েছিল ১ কোটি টাকা। ভারতের বামপন্থী উগ্রবাদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মিসির বেসরা পূর্ব ভারতের কুখ্যাত ‘রেড করিডোর’ বা মাওবাদী-প্রভাবিত বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনটির যাবতীয় কার্যক্রম সুচারুভাবে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। নিরাপত্তা রক্ষীদের ওপর নির্মম হামলা, বেপরোয়া তোলাবাজি, অবৈধ অস্ত্র পাচার এবং ভয়াবহ হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অসংখ্য ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

পুলিশ সূত্রের প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, গিরিডি জেলার মূল নিবাসী মিসির বেসরাকে অত্যন্ত সুকৌশলে ধানবাদ জেলা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং ঝাড়খণ্ড পুলিশের যৌথ উদ্যোগে গঠিত বিশেষ দল এই সফল অভিযান চালায়। এর আগে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে কড়া নজর রাখা হয়েছিল। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এই অভিযানে ধরা পড়া অন্য চার মাওবাদীর নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ প্রেস বিবৃতি প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রায় দুই দশক ধরে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান এবং বিপুল সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও বেসরা প্রতিবারই নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সিপিআই (মাওবাদী)-র পলিটব্যুরোর এই অভিজ্ঞ ও প্রবীণ সদস্য এর আগে ২০০৭ সালে একবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০০৯ সালে তিনি পুলিশি হেফাজত থেকেই চতুরতার সঙ্গে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঝাড়খণ্ডের দুর্গম বনাঞ্চলে তল্লাশি অভিযান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরিবারবর্গের মাধ্যমে তাঁকে বারবার আত্মসমর্পণের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল। বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে যে, মিসির বেসরা একাই একাধিক রাজ্যে মোট ১৫৪টি চাঞ্চল্যকর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। বছরের পর বছর ধরে মাওবাদীদের একাধিক বড় আকারের নাশকতামূলক হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাঁর নাম উঠে এসেছে। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল রাজ্যে দায়ের করা বহু নাশকতার মামলায় তিনি সরাসরি অভিযুক্ত ছিলেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ধৃত এই শীর্ষ নেতাদের নিবিড়ভাবে জেরা করার মাধ্যমে দেশের মাওবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্য হাতে আসবে। এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে মাওবাদীদের সক্রিয় আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাডারদের সঠিক পরিচয়, গোপন সাংগঠনিক কাঠামো, আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের নিরাপদ রুট, লজিস্টিক বা রসদ সহায়তা ব্যবস্থা, ফান্ডিং বা অর্থ সংগ্রহের মূল উৎস এবং আগামী দিনে তাদের কোনো বড় নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তার বিস্তারিত বিবরণ। উল্লেখ্য, ঠিক এর আগের দিন মঙ্গলবারই ঝাড়খণ্ড পুলিশের কাছে একসঙ্গে ১৬ জন মাওবাদী চরমপন্থী অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য আত্মসমর্পণ করেছেন। এই আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে ছয়জন দুর্ধর্ষ বিদ্রোহী ছিলেন, যাঁদের সবার মাথার দাম মিলিয়ে মোট ৩৯ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।

যে মাওবাদীরা অস্ত্র সমর্পণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী)-র আঞ্চলিক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য সন্তোষ মাহাতো, যিনি এলাকায় ‘বাসুদেব দা’ বা ‘দিলীপ’ নামেও সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাঁর মাথার দাম ছিল ১৫ লক্ষ টাকা এবং তিনি একাই ১২৮টি গুরুতর ফৌজদারি মামলায় ‘ওয়ান্টেড’ বা অভিযুক্ত ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, সন্তোষ অতীতে বেশ কয়েকটি বড় ও রক্তক্ষয়ী নাশকতার ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গত ১ মার্চ মনোহরপুর, ছোটানগর এবং ঝারিয়াকেলা থানা এলাকার গভীর বনাঞ্চলে সংঘটিত আইইডি (IED) বিস্ফোরণের ঘটনা, যার জেরে কোবরা (CoBRA) ব্যাটালিয়নের এক বীর জওয়ান গুরুতর আহত হয়েছিলেন।

আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের এই বৃহৎ দলে পাঁচজন মহিলা ক্যাডারও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে রয়েছেন। এই আত্মসমর্পণকারীদের তালিকায় একজন জোনাল কমিটির সদস্য, দুজন সাব-জোনাল কমিটির সদস্য এবং দুজন এরিয়া কমিটির সদস্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও আত্মসমর্পণের পথে হেঁটেছেন নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী)-র জোনাল কমিটির অন্যতম সদস্য চন্দন লোহরা (যিনি ৭৮টি মামলায় অভিযুক্ত এবং যাঁর মাথার ওপর ১০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষিত ছিল), সাব-জোনাল কমিটির সদস্য অনিল টুড়ি (ওরফে উজ্জ্বল) এবং সুখলাল বিরজিয়ান (ওরফে আকেলা)—যাঁদের প্রত্যেকের মাথার দাম ছিল ৫ লক্ষ টাকা করে। পাশাপাশি, এরিয়া কমিটির সদস্য সুদেশ হোনহাগা (ওরফে সোনারাম হোনহাগা) ও ঋষিব—যাঁদের প্রত্যেকের মাথার দাম ছিল ২ লক্ষ টাকা করে, তাঁরাও অস্ত্র ত্যাগ করেছেন। এছাড়া জোনাল কমিটির সদস্য সন্তোষ মাঝি (ওরফে জগবন্ধু)-ও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আত্মসমর্পণকারী ক্যাডাররা পুলিশের কাছে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র জমা দিয়েছেন। তাঁরা মোট ছয়টি ইনসাস (INSAS) রাইফেল, দুটি অত্যাধুনিক একে-৪৭ (AK-47) রাইফেল, ৩৮টি ম্যাগাজিন এবং ১,৫৬২ রাউন্ড তাজা গুলি স্বেচ্ছায় সমর্পণ করেছেন। রাজ্য পুলিশের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ঝাড়খণ্ডে মাওবাদীবিরোধী যৌথ অভিযান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য গতি লাভ করেছে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে মোট ৯৩ জন মাওবাদীকে গ্রেফতার করেছে, ৪৫ জন ক্যাডারের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করেছে এবং বিভিন্ন সংঘাতে ২২ জন চরমপন্থীকে সফলভাবে নিকেশ করেছে।