ভারতের ঘরেই আটকে ইরানের ৭ বিলিয়ন ডলার! ট্রাম্পের সেই সিদ্ধান্তের জের কি এখনও বহাল?

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে নয়া সমীকরণ তৈরির ইঙ্গিত মিলছে। এরই মধ্যে ইরান আবারও বিদেশে আটকে থাকা তাদের বিপুল সম্পদের প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে এসেছে। তেহরানের দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কয়েক বিলিয়ন ডলার আটকে রয়েছে, যা উদ্ধার করতে তারা এখন জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত, যেখানে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার আটকে রয়েছে বলে দাবি ইরানের। জানা গিয়েছে, মূলত অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) কেনাবেচার পাওনা বাবদ এই বিপুল অর্থ ভারতের কাছে আটকে রয়েছে।

এই জটিলতার শিকড় প্রোথিত রয়েছে ২০১৮ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন, তখন থেকেই পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে শুরু করে। এর পরপরই ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করত, তাদের ওপরও এর কালো ছায়া পড়ে। সেই তালিকায় ভারত অন্যতম। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ভারতীয় ব্যাঙ্ক ও কোম্পানিগুলো ইরানকে তেলের মূল্য পরিশোধ করা কার্যত বন্ধ করে দেয়।

আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পন্ন হয় মার্কিন ডলারে। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লেনদেন করলে যেকোনো ব্যাঙ্ককে গ্লোবাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি ছিল। নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার রোষানল থেকে বাঁচতে ভারতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থপ্রদান স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ভারতের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না, কারণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে ভারতের বৃহত্তর আর্থিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারত।

ভারত একা নয়, ইরান দাবি করেছে যে চিন, ইরাক, জাপান ও কাতারের মতো দেশগুলোতেও তাদের বিপুল অর্থ আটকে রয়েছে। এর মধ্যে চিনের কাছেই সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, বিদেশে আটকে থাকা তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই সম্পদ উদ্ধার করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের অর্থনীতির জন্য এই তহবিল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ও নগদ অর্থের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এই অর্থ যদি ফেরত পাওয়া যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে এক প্রকার সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করবে। সরকারি ব্যয় নির্বাহ থেকে শুরু করে বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি সঞ্চারে এই মূলধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত ও ইরানের মধ্যে জ্বালানি এবং কৌশলগত সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ফলে, আটকে থাকা এই অর্থপ্রদানের বিষয়টি ভারত-ইরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। এটি কোনোভাবেই ভারতের ইচ্ছাকৃত ভুল নয়, বরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাধ্যবাধকতা। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা কি এই জট খুলতে পারবে? আগামী দিনে এই ৭ বিলিয়ন ডলারের ফয়সালা কীভাবে হয়, তা নিয়ে সতর্ক পর্যবেক্ষণে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।