ব্রিগেড যখন গেরুয়া, রাইটার্সের অলিন্দে তখন বড় প্রশ্ন— জ্যোতি বসু-মমতার রেকর্ড কি ভাঙতে পারবেন শুভেন্দু?

পশ্চিমবঙ্গের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে— বাংলা তার রাজনৈতিক অভিমত খুব ঘনঘন পরিবর্তন করে না। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যেখানে প্রায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারের পালাবদল দেখা যায়, সেখানে বাংলার মাটি বরাবরই ধারাবাহিকতা আর দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে। শনিবার ব্রিগেডের ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে শুভেন্দু অধিকারী যখন বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— জ্যোতি বসু বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিনিও কি কয়েক দশকের একাধিপত্য কায়েম করতে পারবেন?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র বলছে, ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর বামফ্রন্ট শাসন করেছে। যার সিংহভাগ সময় রাজ্যের হাল ছিল জ্যোতি বসুর হাতে। এরপর ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব কায়েম রেখেছিলেন। অর্থাৎ, গত ৫০ বছরে বাংলা শাসন করেছেন মূলত তিনজন মুখ্যমন্ত্রী। কর্ণাটক বা উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে যেখানে কয়েক বছর অন্তর মুখ্যমন্ত্রী বদল জলভাত, সেখানে বাংলার এই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল নিদর্শন।

কেন বাংলা একটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর বারবার ভরসা রাখে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো শক্তিশালী ‘ক্যাডার ভিত্তিক’ সংগঠন। সিপিএম যে বুথস্তরের পরিকাঠামো তৈরি করেছিল, তৃণমূলও সেই একই পথে হেঁটে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্দরে প্রবেশ করেছে। উন্নয়ন শুধু ভোটের ইস্যু নয়, এখানে আবেগ ও মতাদর্শ বড় ভূমিকা পালন করে। বামেদের শ্রেণি সংগ্রাম হোক বা মমতার বাঙালি আবেগ ও জনমুখী প্রকল্প— ভোটাররা একবার কোনও শক্তির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করলে সহজে সেই মোহভঙ্গ হয় না।

দ্বিতীয়ত, দুর্বল বিরোধী শক্তিও এই ধারাবাহিকতার এক বড় কারণ। দীর্ঘকাল কংগ্রেস বামেদের রুখতে ব্যর্থ হয়েছিল, আবার পরে বাম ও কংগ্রেস সম্মিলিতভাবেও তৃণমূলকে টলাতে পারেনি। এবার বিজেপি সেই শূন্যস্থান পূরণ করে প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক হলো, তিনি তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।

বর্তমানে বিজেপির এই জয় শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং বাংলায় এক সর্বভারতীয় দলের পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুভেন্দু যদি গ্রামাঞ্চলে স্থায়ী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেন এবং কেন্দ্রীয় অনুদান ও প্রকল্পগুলি সরাসরি বুথস্তরে পৌঁছে দিতে সফল হন, তবে বাংলার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তাঁর পক্ষেও কাজ করবে। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলা যাঁকে একবার ‘স্বাভাবিক শাসক’ হিসেবে মেনে নেয়, কয়েক দশক তাঁর ওপর থেকেই আশীর্বাদ সরায় না। এখন দেখার, শুভেন্দু অধিকারী কি সেই ‘লিগ্যাসি’ ধরে রেখে জ্যোতি বসু বা মমতার রেকর্ড ছুঁতে পারেন কি না।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy