বেতন ৩০ হাজার! গৃহিণীদের অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ আদালতের!

গৃহস্থালির কাজ সামলানো মহিলাদের শুধুমাত্র ‘গৃহবধূ’ বা ‘হোমমেকার’ বলে সম্বোধন করা তাঁদের প্রকৃত অবদানের পরিপন্থী। দেশের সর্বোচ্চ আদালত এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, একজন গৃহিণীর ভূমিকা কেবল রান্নাঘর বা চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁরাই প্রকৃত ‘নেশন বিল্ডার’ বা জাতি নির্মাতা। বিচারপতি সঞ্জয় করোলের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের মতে, গৃহিণীরা যে অসামান্য ত্যাগ ও শ্রম দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লালন-পালন করেন এবং পরিবারকে শক্তিশালী করেন, তা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

আদালত বিবাহিত জীবনে নারী-পুরুষের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে কঠোর বার্তা দিয়েছে। বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে যে, বিয়েকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয় যেখানে গৃহস্থালির সমস্ত দায়ভার শুধুমাত্র মহিলার ওপর বর্তায়। আদালত বলেছে, ”বিয়ে মানেই গৃহপরিচারিকা নিয়োগ নয়।” স্বামী ও স্ত্রীর সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত এবং বিয়ের পর কোনো মহিলার ব্যক্তিগত স্বপ্ন বা পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। যদি কোনো মহিলা পেশাগত জীবনে সফল হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের স্থিতিশীল পরিবেশ দিতে চান, তবে তাকে কোনোভাবেই শ্বশুরবাড়ির প্রতি নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হবে না। নারীর নিজস্ব পরিচিতি বিয়ের পরও অক্ষুণ্ণ থাকে, যা এই রায়ে সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, গৃহিণীদের অবৈতনিক শ্রম দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকেছে, কিন্তু এই কাজ উৎপাদনশীল। যৌথভাবে অর্জিত পারিবারিক সম্পত্তিতে গৃহিণীদের সমান গুরুত্ব ও অধিকার থাকা উচিত, কারণ বছরের পর বছর ধরে তাঁদের পরিচর্যা পরিষেবার মাধ্যমেই পরিবার সমৃদ্ধ হয়।

দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক নির্দেশিকা জারি করেছে শীর্ষ আদালত। গৃহিণীদের গৃহস্থালির পরিচর্যা পরিষেবার মূল্য হিসেবে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় গৃহিণীর মৃত্যুর পর পরিবার যে সেবা ও পরিচর্যার ক্ষতি বহন করে, তার আর্থিক মূল্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় এখন থেকে এই নতুন মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সমস্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোটর যান আইনের ১৬৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘সারাংশ পদ্ধতি’ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের মুখে না পড়তে হয়। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় শুধুমাত্র গৃহিণীদের অবৈতনিক শ্রমকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, বরং পারিবারিক কাঠামোয় মহিলাদের মর্যাদা ও অধিকারকে এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করছে। এটি সমাজ ও অর্থনীতির বিচারে এক শক্তিশালী সামাজিক বার্তা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy