ফিনল্যান্ডে এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ইউরোপের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইউরোপ এমন অস্ত্র বিক্রি করছে যা ভারতের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। জয়শঙ্করের কথায়, “কোনো ইউরোপীয় দেশ কখনোই ভারতীয় অস্ত্র দ্বারা আক্রান্ত হয়নি, কিন্তু ইউরোপীয় অস্ত্র বারবার ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।” এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তবে পাকিস্তান কি এখনো ইউরোপীয় অস্ত্রের ওপর ভরসা করছে?
পাকিস্তানের অস্ত্র ভাণ্ডারে ইউরোপীয় সংযোগ
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় পাকিস্তান বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণে সুইডেন, ফ্রান্স, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানিতে ইউরোপের অংশ ছিল ২০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে ২০২১-২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক এবং ব্রিটেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সামান্য চাহিদাই কেবল পূরণ করছে।
নেদারল্যান্ডস ও তুরস্ক: পাকিস্তানের নতুন ভরসা
বর্তমানে নেদারল্যান্ডস পাকিস্তানের নৌবাহিনীর বৃহত্তম সামরিক সহযোগী। ডাচ কোম্পানি ‘ডামেন’ পাকিস্তানের জন্য জাহাজ ও টহল নৌযান নির্মাণে সক্রিয়। ২০২১-২৫ সালের হিসেবে পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৪.৬ শতাংশই আসে ডাচ সংযোগ থেকে। অন্যদিকে, তুরস্ক পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী। পাকিস্তানের মোট আমদানির প্রায় ৭ শতাংশ আসে তুরস্ক থেকে। উভয় দেশের যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ এবং ‘বায়রাক্তার টিবি২’ ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ কৌশলগত সম্পর্কের প্রমাণ দেয়। ব্রিটেন যদিও সরাসরি অস্ত্র বিক্রিতে কিছুটা সংযত, তবুও ২০১৫ সাল থেকে ১০৪ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের প্রতিরক্ষা যন্ত্রাংশ তারা পাকিস্তানকে সরবরাহ করেছে।
কেন কমছে ইউরোপের অস্ত্র?
ইউরোপ থেকে পাকিস্তানের অস্ত্র কেনার হার কমে যাওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে: প্রথমত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোতে নিজেই অস্ত্রের টান পড়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারতের শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের চরম অর্থনৈতিক সংকট। এই শূন্যস্থান দ্রুত ভরাট করছে চীন।
চীনের একচ্ছত্র দাপট
বর্তমানে পাকিস্তানের সামরিক চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই মেটাচ্ছে চীন। SIPRI-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সময়ে পাকিস্তানের প্রধান অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই এসেছে বেইজিং থেকে। এফসি-৩১ স্টেলথ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে জে-১০সি— পাকিস্তানের আকাশপথের শক্তির মূল কারিগর আজ চীন। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে চীনের এই ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি কেবল দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তাকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং ইউরোপীয় দেশগুলোর নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জয়শঙ্করের এই সতর্কতা মূলত বিশ্বশক্তিগুলোকে তাদের অস্ত্র বিক্রির নীতি পুনর্বিবেচনা করার এক চূড়ান্ত বার্তাই দিল।





