“‘ওভাবে ঘুরে হাততালি কুড়ানোর জায়গা নয়!’ ২১ জুলাইয়ের মঞ্চের বিশৃঙ্খলা নিয়ে অভিষেককে তীব্র আক্রমণ কল্যাণের”

গত ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহাসিক শহিদ দিবসের মঞ্চে দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্য বাদানুবাদ এবং মতবিরোধের জল্পনা এখন রাজনৈতিক মহলের হটকেক। সভা চলাকালীন ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেন তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর এতখানি ক্ষুব্ধ, তা নিয়ে বুধবার এক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন শ্রীরামপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নয়, দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ও আচরণ নিয়েও রীতিমতো আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি। একুশের মঞ্চের সেই অন্তর্ঘাত ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ এখন ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন খোলামেলাভাবে বলেন, ‘‘গত ২১ জুলাই দুপুর ১২টা বেজে ৪১ মিনিট নাগাদ আমি সোজা দিদিকে টেক্সট করি যে আপনি মঞ্চে তাড়াতাড়ি আসুন। এরপর ১২টা বেজে ৪৫ মিনিটে দিদি আমাকে জানান যে বিজেপির লোকেরা তাঁকে আটকে রেখেছে, তাই তিনি আসতে পারছেন না। সেই পরিস্থিতিতে আমাকেই প্রথম বক্তৃতা শুরু করতে বলা হয়। আমি যখন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য রাখছি, ঠিক তখনই অভিষেক মঞ্চে এসে পৌঁছায়। অভিষেক আসার পর পুরো মঞ্চজুড়ে হেঁটে বেড়ায় এবং লোকজনের কাছ থেকে হাততালি কুড়ানোর চেষ্টা করে। এর জেরে আমাকে বাধ্য হয়ে প্রায় ৫ থেকে ৭ মিনিট আমার বক্তৃতা থামিয়ে রাখতে হয়েছিল। একজন বক্তা যখন কথা বলছেন, তখন ঠিক মাঝপথে এভাবে মঞ্চে ঘুরে বেড়ানো এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যে সাধারণ রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। আমার পপুলারিটি বা জনপ্রিয়তা কতটা, তা জাহির করার জায়গা তো একুশের শহিদ মঞ্চ হতে পারে না! বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরেও তো সে কাজ করা যেত। একটা বক্তৃতা চলার সময় এভাবে বারবার ডিস্টার্বেন্স তৈরি করা একদমই কাম্য নয়।’’

বক্তব্যের মাঝপথে এই ধরণের অযাচিত বাধার কারণে তাঁকে মোট কতক্ষণ সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল, তা স্পষ্ট করে কল্যাণ আরও জানান, ‘‘অভিষেক আসার ফলে আমাকে যেমন ৫ থেকে ৭ মিনিট বক্তৃতা বন্ধ রাখতে হয়েছিল, ঠিক তেমনই পরবর্তী সময়ে যখন মমতাদি সভামঞ্চে প্রবেশ করলেন, তখন তাঁকে একঝাঁক দেখার জন্য উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র হইচই শুরু হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই সেই উচ্ছ্বাসের কারণে আমাকে আরও ৫ থেকে ৭ মিনিট বক্তৃতা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সবমিলিয়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ মিনিট সময় ধরে আমাকে একটানা বক্তৃতা বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে হয়েছিল। রাজনৈতিক মঞ্চে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা কাজের কাজকে ব্যাহত করে।’’

এখানেই থেমে থাকেননি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিগত দিনে দলবদল করা এবং সুযোগসন্ধানীদের তীব্র আক্রমণ করে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, ‘‘যারা অতীতে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তারা কেন গেল? একসঙ্গে তো তারা বলতে পারত। ২০২২ সালে আমি যখন দলের অন্দরে অসন্তোষ প্রকাশ করে অভিষেকের বিরুদ্ধে বলেছিলাম, তখন এই সুবিধাবাদী ৮০ জন নেতা কোথায় লুকিয়ে ছিল? তখন তো তারাই অভিষেককে তেলিয়ে বেড়াচ্ছিল। ৬০-৬৫ জন হোক আর এই ২০ জনই হোক—একমাত্র কাকলি ঘোষ দস্তিদার ছাড়া, আমি আপনাদের একদম স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, একমাত্র কাকলি ছাড়া বাকি সবাই সেদিন চুপ ছিল। এমনকি সুখেন্দু শেখর রায় সেদিন চিফ হুইপ পদ থেকে আমাকে পদত্যাগ করানোর জন্য একটা পরিকল্পিত প্লট তৈরি করেছিলেন। ২০২২ সালের সেই ঘটনার সাক্ষী একমাত্র কাকলি, কারণ সেদিনও সে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল।’’

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কল্যাণ আরও বলেন, ‘‘একজন সাধারণ ভদ্রমহিলা এসে আমাকে কী বলেছেন জানেন? তিনি অনুরোধ করেছিলেন, দিদিকে একটু মানুষের মধ্যে ঘুরতে বলুন, মাঠে-ঘাটে বেরোতে বলুন, নাহলে আমরা সাধারণ কর্মীরা আর লড়াই করার সাহস পাচ্ছি না। তাহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ঠিক কী করছেন? শুধু নিজের ব্যক্তিগত বাড়ি আর কালীঘাটের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে থাকলেই তো রাজনীতি হয় না। দলের প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের মধ্যে ময়দানে নামতে হবে ভাই। ডিম খাই, লাঠি খাই, গালাগাল খাই কিংবা পুলিশের ধাওয়া খাই—রাজনীতি করতে গেলে তো এসবের মুখোমুখি হতেই হবে। শুধু ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বসে এসি রুমে মিটিং করলে তো দল চলে না। আজও আমি বিশ্বাস করি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চাইছে এবং মানুষ মমতাদির দিকেই তাকিয়ে আছে। মমতাদির হাত শক্ত করে তাঁর হয়ে লড়াই করার জন্য আমি আজও এক পায়ে প্রস্তুত আছি। কিন্তু দিদিকেও এবার দলের কঠোর ও রূঢ় বাস্তবটা বুঝতে হবে। দিদি যদি নিজে থেকে এই বাস্তব পরিস্থিতি না বোঝেন, তবে মনে রাখবেন—দিদি নিজের হাতেই যে তৃণমূল কংগ্রেস দল তিল তিল করে তৈরি করেছেন, সেই দলকেই একদিন নিজহাতে শেষ করে দেবেন। এর বেশি আজ আর আমার কিছু বলার নেই।’’