বিহারের মাটি থেকে সোজা ব্রিটেনের মন্ত্রিসভায়! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মন্ত্রীর পদে বসেই কোন হুংকার দিলেন কনিষ্কা নারায়ণ?

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিমণ্ডলে এক অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিহারের মুজাফফরপুরে জন্মগ্রহণকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ কনিষ্কা নারায়ণ যুক্তরাজ্য সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। ব্রিটেনের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) মন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য হিসেবে পা রাখার মাত্র দু’বছরের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় এই শীর্ষ স্থান অর্জন করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপরিহার্যতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে, কনিষ্কা নারায়ণের এই অন্তর্ভুক্তি তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই ঐতিহাসিক নিয়োগের পর নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে কনিষ্কা নারায়ণ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন যে, আধুনিক বিশ্বে দেশগুলোর হাতে এআই-কে নিজের মতো করে রূপ দেওয়ার কিংবা এর দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অত্যন্ত সীমিত সময় রয়েছে। ব্রিটেন বর্তমানে ঠিক সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে উপস্থিত হয়েছে। যতদিন এই সুযোগ ও ক্ষমতা খোলা থাকবে, তিনি সম্পূর্ণভাবে এআই প্রযুক্তির সঠিক রূপায়ণ এবং দেশের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের দিকেই নিজের নজর নিবদ্ধ রাখবেন। তাঁর এই সুদূরপ্রসারী ভাবনা বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদেরও নজর কেড়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় এক সুদূরপ্রসারী ও বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়েছেন। এই প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে গঠিত স্বতন্ত্র বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিভাগ (ডিএসআইটি) বিলুপ্ত করা হয়েছে। কনিষ্কা নারায়ণের এই নতুন এবং অত্যন্ত অভিনব ভূমিকাটি ক্যাবিনেট অফিস এবং বৃহত্তর ব্যবসা, উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ—উভয় দপ্তরের সঙ্গেই গভীরভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তিনি সরাসরি ব্রিটেনের সামগ্রিক এআই কৌশলের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন, যা আগামী দিনে দেশের প্রযুক্তি নীতি নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

কনিষ্কা নারায়ণের এই উত্থান নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের রোমাঞ্চকর ইতিহাস। ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে বিহারের মুজাফফরপুরে এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার প্রথমে দিল্লিতে এবং পরবর্তীতে যখন তাঁর বয়স মাত্র বারো বছর, তখন ওয়েলসের কার্ডিফে স্থায়ীভাবে চলে যায়। যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত হওয়ার পর তাঁর বাবা-মায়ের জীবনের প্রথম দিকের চরম সংগ্রাম ও অভাবের দিনগুলোর সাক্ষী ছিলেন কনিষ্কা। ন্যূনতম মজুরিতে কাজ এবং রাতের শিফটে চাকরি করার মতো প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বড় হওয়ার সুবাদে সমাজের সমান সুযোগ এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কার্ডিফের একটি সাধারণ সরকারি স্কুলেই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন কনিষ্কা নারায়ণ। পরবর্তীতে তাঁর অসাধারণ মেধার জোরে তিনি ব্রিটেনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইটন কলেজে সম্পূর্ণ বৃত্তির সুযোগ পান। ইটন থেকে সফলভাবে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যালিওল কলেজে দর্শন, রাজনীতি এবং অর্থনীতি (PPE) নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। এখানেই তাঁর শিক্ষার শেষ হয়নি; পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বা এমবিএ (MBA) ডিগ্রি অর্জন করে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিধিকে আরও প্রসারিত করেছিলেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করার পর কনিষ্কা নারায়ণ ফিন্যান্স, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং জননীতি বা পাবলিক পলিসির মতো অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে নিজের বর্ণময় কর্মজীবন গড়ে তোলেন। তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক ‘ল্যাজার্ড’-এ অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন। সেখানে তিনি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানি বোর্ড, সরকারি অর্থ মন্ত্রক এবং উদীয়মান প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও কৌশলগত পরামর্শ দিতেন। তাঁর পেশাগত কাজের মূল ফোকাস ছিল মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ফিনটেক এবং বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের উদ্যোগগুলোর ওপর।

পরবর্তীতে তিনি ‘অ্যাটোমিকো’ এবং ‘ক্লোকটাওয়ার ভেঞ্চারস’-এর মতো প্রথমসারির ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি স্টার্টআপ এবং বৃহৎ বিনিয়োগকারী দলগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি কনিষ্কা নারায়ণ যুক্তরাজ্য সরকারের অত্যন্ত দক্ষ অর্থনীতিবিদ এবং সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি মন্ত্রিসভার বিভিন্ন সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ে তিনি যুক্তরাজ্যের সুদূরপ্রসারী ২৫-বছর মেয়াদী পরিবেশ পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতেও অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজ তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য প্রবাসী ভারতীয়দের মুখ উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নতুন দিশা হয়ে উঠেছে।