অনন্তনাগে হেড কনস্টেবল হত্যাকাণ্ডের বদলা? কাশ্মীরে রাতারাতি আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে পাকড়াও করল সেনা!

জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় পুলিশের এক কর্তব্যরত হেড কনস্টেবলকে নৃশংসভাবে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোটা উপত্যকা। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর উপত্যকাজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী এক নজিরবিহীন ও ব্যাপক ধরপাকড় অভিযান শুরু করেছে। গত কয়েক দিনের এই সাঁড়াশি অভিযানে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী যৌথভাবে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করেছে। শুধু তাই নয়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুই স্থানীয় সন্দেহভাজন জঙ্গির পৈতৃক ও স্থাবর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মোদী সরকারের জমানায় উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করা হলেও, সাম্প্রতিক এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা এবং তার পরবর্তী তীব্র প্রশাসনিক পদক্ষেপ ফের একবার কাশ্মীরের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর এই লাগাতার সাঁড়াশি অভিযানের জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের মারফত প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে, এই ব্যাপক আটকের ফলে বহু পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা তরুণ সদস্যরা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং আটক ব্যক্তিদের তালিকায় অনেক সাধারণ নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুই সন্দেহভাজন জঙ্গির বাড়ি ভাঙার এই কঠোর পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দেশ বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে জানানো হয়েছে যে, জঙ্গিদের মদতদাতা ও সহানুভূতিশীলদের বিরুদ্ধে এটি একটি অত্যন্ত শক্ত বার্তা এবং এই ধরনের জিরো টলারেন্স নীতি সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেবে। কিন্তু অন্যদিকে, প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকরা বলছেন যে, গণহারে এই ধরনের ধরপাকড় এবং বিনা বিচারে সম্পত্তি ধ্বংসের প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।

জম্মু-কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ প্রশাসনের এই কঠোর ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, নির্বিচারে বাড়ি ভাঙা এবং গণগ্রেফতারের মতো পদক্ষেপ উপত্যকার সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে তা আরও অনেক বেশি জটিল করে তুলবে। ওমর আবদুল্লাহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে মন্তব্য করেছেন যে, “এভাবে সাধারণ মানুষকে যৌথভাবে শাস্তি দিলে কখনই স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে না। আমাদের অবশ্যই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া লড়াই চালাতে হবে, কিন্তু সেই লড়াই যেন কোনোভাবেই নিরপরাধ ও সাধারণ মানুষের ওপর কোপ না বসায়।” তাঁর এই ভারসাম্যপূর্ণ ও কঠোর মন্তব্য ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতি ও উপত্যকার মহলে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছে। অন্যদিকে, পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (PDP) প্রধান তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এই নিরাপত্তা অভিযানকে আরও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘গণশাস্তি’ (Collective Punishment) বলে অভিহিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের অমানবিক কাজের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

মেহবুবা মুফতি আরও জোরালো ভাষায় বলেন যে, কোনো অপরাধমূলক ঘটনার জন্য অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া উচিত, কিন্তু একজনের অপরাধের জন্য তার পুরো পরিবার কিংবা গোটা একটি এলাকাকে এভাবে সামূহিক শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই ধরনের অন্যায় ও একপেশে পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ জমাবে এবং তাতে কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক মোড় নেবে। অনন্তনাগের এই মর্মান্তিক ঘটনার পরবর্তী সময়ে উপত্যকার অলিগলিতে থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিবেশ বিরাজ করছে। অনেক আতঙ্কিত পরিবার ও পরিজনদের দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়। যুবকদের নির্বিচারে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বহু এলাকার মায়েরা ও বোনেরা রাস্তায় নেমে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং উগ্রপন্থা দমনের লড়াইয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এই কঠোর পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত উপত্যকায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ফিরিয়ে আনতে সফল হবে, নাকি সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও উসকে দেবে—সেটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।