বিশ্বজুড়ে এআই ও চিপ নিয়ে হঠাৎ আতঙ্ক কেন? এক ধাক্কায় রেকর্ড নেমে গেল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ার বাজার!

সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বাজারে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন পতন দেখা গেছে। সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর শেয়ারে ব্যাপক শেয়ার বিক্রির হিড়িকের কারণে দেশটির প্রধান শেয়ার বাজার সূচক, কোস্পি (KOSPI), এক ধাক্কায় ৭২৪.৩৭ পয়েন্ট বা ১০.৭৩ শতাংশ কমে সুদূর ৬০৩১.৩৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। পরিস্থিতির অবনতি এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল যে, স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে ২০ মিনিটের জন্য সমস্ত লেনদেন সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে হয়েছিল। উল্লেখ্য, এই বাজার পতনের ধাক্কা শুধু দক্ষিণ কোরিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর প্রভাবে জাপানের বিখ্যাত নিক্কেই ২২৫৮ এবং তাইওয়ানের তাইক্স সূচকও ৪ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। বাজারের এই তীব্র অস্থিরতার পেছনে প্রধানত তিনটি বড় কারণ সামনে উঠে এসেছে।

বাজার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রথম কারণটি হলো এআই (AI) খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মানসিকতায় বড় ধরনের বদল। বিগত কিছু সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সম্পর্কিত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যে, এআই সেক্টরে এই বিশাল অংকের অন্ধ বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে আদৌ টেকসই হবে কি না। এর মাঝেই বিশ্বের বৃহত্তম চিপ নির্মাতা কোম্পানি এনভিডিয়া প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি বিশাল এআই পরিকাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও তাদের শেয়ার বাজার চাপের মুখে রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংকিয়ার প্রিভি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভে-সার্ন লিং এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, অতীতে বিনিয়োগকারীরা এআই সম্পর্কিত যেকোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক খবরকে শেয়ার কেনার সুযোগ হিসেবে গণ্য করতেন, কিন্তু বর্তমান সময়ে ঠিক তারাই সামান্যতম নেতিবাচক খবর পেলেই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন।

বাজারের উপর এই তীব্র চাপ সৃষ্টির দ্বিতীয় বড় কারণটি এসেছে চীন থেকে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, চীনের একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নির্দিষ্ট কিছু চিপ তৈরির মেশিনের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে। ব্লুমবার্গের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, সাংহাইভিত্তিক একটি কোম্পানি বর্তমানে আধুনিক ডিইউভি (DUV) লিথোগ্রাফি মেশিন তৈরি করছে। এই ঘটনাটি বিশ্বের বৃহত্তম চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএসএমএল হোল্ডিং-এর ব্যবসায়িক বিক্রির উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, চীনের চ্যাংজিন মেমোরি টেকনোলজিস (CXMT)-এর আকাশচুম্বী ও দ্রুত বৃদ্ধিও বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর স্টকগুলোতে তীব্র বিক্রির চাপ ত্বরান্বিত করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় বাজারে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে দেশের দুই মহারথী কোম্পানি—স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্সের শেয়ার দরপতনের কারণে। এর মধ্যে এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে টেক জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের শেয়ার পতন ঘটেছে ৯.১৫ শতাংশ। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এসকে হাইনিক্সের মার্কিন এডিআর (ADR)গুলো তাদের প্রাথমিক অফার মূল্যের নিচে নেমে একেবারে রেকর্ড সর্বনিম্নে গিয়ে ঠেকেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। যেহেতু এই দুটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি একাই কোস্পি সূচকের ৫০ শতাংশের বেশি অংশীদারিত্ব বহন করে, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের শেয়ারের এই ব্যাপক পতন গোটা দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বাজারকে খাদের কিনারায় নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে।