“বিয়ের আংটিতে বড় বদল!”-হিরের দাম আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার আসল কারণ কী?

বিলাসবহুল জীবনযাপন ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে হীরা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে আলাদা জায়গা দখল করে রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি এই মূল্যবান পাথরটির দাম নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গত পাঁচ বছরে প্রাকৃতিক হীরার দামে দেখা দিয়েছে এক ঐতিহাসিক পতন। র‍্যাপাপোর্ট গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে প্রাকৃতিক হীরার বাজারদর কার্যত তলানিতে ঠেকেছে।

ঠিক কতটা কমল প্রাকৃতিক হীরার দাম?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে যেখানে এক ক্যারেট প্রাকৃতিক হীরার গড় দাম ছিল প্রায় ৮ হাজার ৭ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা), বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৮৯৮ মার্কিন ডলারে (প্রায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকা)। অর্থাৎ, গত পাঁচ বছরে প্রাকৃতির হীরার দাম এক ধাক্কায় কমেছে প্রায় ৫১ শতাংশ! শুধু তাই নয়, বিনিয়োগযোগ্য মানের হীরার দামের সূচক ‘ডায়মন্ড স্ট্যান্ডার্ড ইনডেক্স’ও সম্প্রতি এর সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।

বাজারে প্রাকৃতিক হীরার দাম হ্রাসের আসল কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক হীরার এই বিপুল দরপতনের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে—
১. অতিরিক্ত সরবরাহ: করোনা মহামারির সময়ে উৎপাদন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাজারে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত হীরা জমে যায়।
২. ল্যাব-গ্রোন বা কৃত্রিম হীরার উত্থান: প্রাকৃতিক হীরার বিকল্প হিসেবে বাজারে এখন রাজত্ব করছে ল্যাবে তৈরি হীরা। রাসায়নিক ও ভৌত গঠনে হুবহু এক হলেও, ল্যাব-গ্রোন হীরা তৈরি করতে খনন বা অতিরিক্ত শ্রমের প্রয়োজন হয় না। ফলে এর উৎপাদন খরচ অনেক কম। যেখানে এক ক্যারেট প্রাকৃতিক হীরার দাম প্রায় ৩ হাজার ডলার, সেখানে সমমানের ল্যাব-গ্রোন হীরা মিলছে মাত্র ৪৫০ ডলারে। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক হীরার তুলনায় এর দাম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।

বিয়ের আংটিতেও বদলাচ্ছে ক্রেতাদের পছন্দ
কম দামে বড় সাইজের এবং নিখুঁত হীরা পাওয়ায় আধুনিক ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ এখন ল্যাব-গ্রোন হীরা। ‘দ্য নট’-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিক্রি হওয়া মোট বাগদানের আংটির প্রায় ৬১ শতাংশের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই ল্যাব-গ্রোন হীরা। ২০২০ সালের তুলনায় এই হার বেড়েছে প্রায় ২৩৯ শতাংশ! সাধ্যের মধ্যে শখের জিনিস মেলায় মানুষ এখন প্রাকৃতিক হীরার ওপর থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

খনি বন্ধ করেও কি দাম সামলানো সম্ভব?
পরিস্থিতি সামাল দিতে হীরা উৎপাদক সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে। ডি বিয়ার্স গ্রুপের মতো সংস্থা দক্ষিণ আফ্রিকার ভেনেশিয়া খনিতে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে আরও কয়েকটি খনি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর রয়েছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের আশা, বাজারে সরবরাহ কমলে প্রাকৃতিক হীরার দাম কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তবে সোনা বা অন্য ধাতুর মতো হীরার নির্দিষ্ট কোনো ‘স্পট প্রাইস’ বা পুনর্বিক্রয়ের শক্তিশালী বাজার না থাকায় একে লভ্যাংশ পাওয়ার মতো আর্থিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, হীরা কেনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যবহারের আনন্দ, বিনিয়োগ নয়। ল্যাব-গ্রোন হীরার দাপটে আগামী দিনে প্রাকৃতিক হীরার বাজার কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার!