ইরানকে ঘিরেই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি? ৩টি রণতরী ও হাজার হাজার সেনা পাঠিয়ে ট্রাম্প

তেল আমদানি-রপ্তানি তো বটেই, বিশ্ববাণিজ্যের সিংহভাগ অংশই বর্তমানে মারাত্মক স্থবির হয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে। একদিকে দুই পক্ষই কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা বলছে, অন্যদিকে বাস্তবে তার উল্টো ছবিই দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি তৃতীয় বিমানবাহী রণতরীর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই সামরিক তোড়জোড় দেখে বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—মুখে কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বললেও, ইরানকে ঘিরে এত বিপুল পরিমাণ সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে আসলে কোন গোপন বার্তা দিতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প?

বিশেষ করে বছরের শেষে আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। এমন সময়ে ইরান যুদ্ধ কীভাবে সামলানো হচ্ছে, তার কোনো নেতিবাচক ফলাফল যে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে আসতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বিশাল সেনাসম্ভার ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র

গত কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সেনা ও ভারী সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত সহ অন্তত ১৯টি স্থান থেকে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মোট মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজারের কাছাকাছি।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের আসনে বসার পর থেকেই এই অঞ্চলে সেনা সংখ্যা বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়। চলতি বছরের শুরু থেকেই একের পর এক ধাপে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে পেন্টাগন:

  • প্রথম ধাপে: পাঠানো হয় ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ এবং আমেরিকা ক্লাস অ্যাসল্ট শিপ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’।

  • দ্বিতীয় ধাপে: যুক্ত হয় মার্কিন বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ এবং ‘ইউএসএস বক্সার’। এর ফলে অঞ্চলটিতে নতুন করে সাড়ে ৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।

  • তৃতীয় ধাপে: প্যারাশুটিং অ্যাসল্টে বিশেষভাবে দক্ষ মার্কিন ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের আরও ২ হাজার সেনাকে সেখানে পাঠানো হয়।

সব মিলিয়ে ইরান সংঘাতের শুরু থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানকে ঘিরে ১২০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে আমেরিকা, যা ২০০৩ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহিনীর উপস্থিতির নিরিখে সর্ববৃহৎ ঘটনা। এই বহরে রয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এফ-৩৫, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং এডব্লিউএসিএস (AWACS) নজরদারি বিমান।

সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ। নভেম্বরের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলে মোট তিনটি বিমানবাহী রণতরী ও দুটি অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং গ্রুপ মোতায়েন থাকবে, যা ট্রাম্পের হাতের বিকল্পগুলিকে আরও শক্তিশালী করবে।

এত সেনা মোতায়েনের আসল উদ্দেশ্য কী?

নতুন করে যুদ্ধ বাঁধানোর কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি ‘টাইম ম্যাগাজিন’-কে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বোমা হামলা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে সমর বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি আসলে ইরানের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনের শর্তে টেবিলে বসানোর একটি নতুন কৌশলমাত্র।

সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তে যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছিল তেহরান। পরিবর্তে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, হামলা বন্ধ করা এবং বিদেশে জব্দ থাকা নিজেদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। তবে সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, কোনো শর্ত মানার আগে তেহরানকে তাদের পারমাণবিক প্রকল্প আলোচনার টেবিলে আনতে হবে।

সামরিক শক্তির পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খাঁড়াও ঝুলিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি ইরানের রেল ও গাড়ি নির্মাণ খাতের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মূল লক্ষ্য এখন ইরানের অবশিষ্ট আর্থিক সক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া। সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক আলোচনার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি বিশ্ব রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।